রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—এই নামটি শুনলেই বাঙালির মনে এক ধরনের আবেগ কাজ করে। তিনি শুধু একজন কবি নন, তিনি আমাদের চিন্তা, সংস্কৃতি আর আত্মপরিচয়ের অংশ। আমরা প্রায়ই ভাবি, তাঁর সম্মান বুঝি শুধু বাংলা বা ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
কিন্তু বাস্তবটা অনেক বড়। আজও বিশ্বের নানা দেশে, নানা শহরে তাঁর নামেই রয়েছে রাস্তা, রাজপথ, প্রমেনাদ, এমনকি পার্ক। এই তথ্য জানলে যে কোনও বাঙালির বুক গর্বে ভরে উঠবে, এতে সন্দেহ নেই।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু কবিতা লেখেননি। তিনি মানুষের কথা বলেছেন। শান্তি, মানবতা, সংহতি আর মুক্তচিন্তার বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর গান আজও শোনা হয় পৃথিবীর নানা প্রান্তে। তাঁর লেখা পড়ে মানুষ ভাবতে শেখে, নিজেকে প্রশ্ন করতে শেখে। তাই তাঁর প্রভাব কেবল বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে এশিয়ার নানা দেশেও তাঁর চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
এই কারণেই বিভিন্ন দেশ তাঁকে শুধু বইয়ে বা স্মৃতিচারণায় আটকে রাখেনি। বরং তাঁর নাম দিয়েছে রাস্তা, পার্ক আর জনসমাগমের জায়গায়। এটা কোনও আনুষ্ঠানিক সম্মান নয়। এটা ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার প্রকাশ।
ফ্রান্স মানেই শিল্প, সাহিত্য আর মুক্তচিন্তার দেশ। সেই ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে একটি রাস্তা। এর নাম রু টেগোর। প্যারিসের মতো শহরে কোনও বিদেশি কবির নামে রাস্তা থাকা মানে ছোট ব্যাপার নয়। এটা প্রমাণ করে, ইউরোপের সাহিত্যচর্চায় রবীন্দ্রনাথ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন।
এই রাস্তা দিয়ে হাঁটলে হয়তো অনেক পর্যটক জানেন না, টেগোর নামের পেছনে কে ছিলেন। কিন্তু জানলে অবাক হবেন, একজন বাঙালি কবির ভাবনা আজও ইউরোপের রাস্তায় বেঁচে আছে।
হাঙ্গেরিতেও রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি খুব যত্ন করে ধরে রাখা হয়েছে। সেখানে রয়েছে টেগোর প্রমেনাদ। প্রমেনাদ মানে এমন একটি পথ, যেখানে মানুষ হাঁটতে আসে, সময় কাটায়। ভাবুন একবার, হাঙ্গেরির মানুষ হাঁটছেন এমন এক পথে, যার নাম একজন বাঙালি কবির নামে।
এটা যেন নিঃশব্দে বলে দেয়, রবীন্দ্রনাথের লেখা শুধু পড়ার জন্য নয়, অনুভব করার জন্য।
তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় রয়েছে রবীন্দ্রনাথ টেগোর স্ট্রিট। নামটা শুনলেই বোঝা যায়, কতটা স্পষ্টভাবে তাঁকে সম্মান জানানো হয়েছে। এখানে নাম বদলে দেওয়া হয়নি, সংক্ষিপ্ত করা হয়নি। সরাসরি তাঁর পুরো নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
এটা দেখায়, তুরস্কের মানুষের কাছেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন শান্তি আর মানবতার প্রতীক।
চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগে রয়েছে ঠাকুরোভা নামে একটি রাস্তা। শুধু রাস্তা নয়, সেখানে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের নামে একটি পার্কও। সেই পার্কে বসানো আছে তাঁর একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি।
এই সম্মানের পেছনে রয়েছে ইতিহাস। পূর্বতন চেকোস্লোভাকিয়ায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গত শতাব্দীর বিশের দশকে দু’বার গিয়েছিলেন। তাঁর সফর, তাঁর বক্তৃতা, তাঁর শান্তির বার্তা সেখানকার মানুষ গভীরভাবে মনে রেখেছেন। তাই আজও প্রাগে ঠাকুরোভা নামে রাজপথ জ্বলজ্বল করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইজরায়েলও রবীন্দ্রনাথকে ভুলে যায়নি। তেল আভিভ শহরে রয়েছে রিহোভ টেগোর নামে একটি রাস্তা। এখানে ‘রিহোভ’ মানে রাস্তা।
একজন বাঙালি কবির নামে ইজরায়েলের রাস্তায় নামকরণ প্রমাণ করে, তাঁর ভাবনা কোনও ধর্ম বা দেশের গণ্ডিতে আটকে ছিল না। তিনি ছিলেন সর্বজনীন।
পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ শহরেও রয়েছে রবীন্দ্রনাথ টেগোর নামে একটি রাজপথ। ইউরোপের এই দেশটিও তাঁর সাহিত্য ও দর্শনের গুরুত্ব স্বীকার করেছে।
এটা ভাবলে ভালো লাগে যে, বাংলার এক কবির নাম উচ্চারিত হচ্ছে এমন সব দেশে, যেখানে বাংলা ভাষাই খুব কম মানুষ বোঝে।
ভারতের নানা প্রান্তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে রয়েছে রাস্তা, সেতু, বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। শান্তিনিকেতন তো তাঁর চিন্তার জীবন্ত উদাহরণ।
বাংলাদেশেও রবীন্দ্রনাথের প্রভাব অপরিসীম। তাঁর গান আমাদের জাতীয় সংগীত। গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই তাঁর লেখা আজও জীবনের সঙ্গে মিশে আছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাস্তা থাকা মানে শুধু অতীতের স্মৃতি নয়। এটা বর্তমানেরও বার্তা। যখন বিশ্বে বিভাজন বাড়ছে, তখন তাঁর মানবতার কথা আবার নতুন করে প্রয়োজন।
একটা রাস্তার নাম অনেক কিছু বলে দেয়। বলে দেয়, কোন চিন্তাকে আমরা সম্মান করি। রবীন্দ্রনাথের নামে রাস্তা মানে শান্তি, সংহতি আর মানুষের প্রতি বিশ্বাসকে সম্মান জানানো।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিঃসন্দেহে বাঙালির গর্ব। কিন্তু তিনি শুধু আমাদের নন। তিনি বিশ্বকবি। তাঁর নাম বিশ্বের নানা দেশের রাস্তায় লেখা আছে, এটা তারই প্রমাণ। আজও পৃথিবীর মানুষ তাঁর দর্শন, তাঁর ভাবনা আর তাঁর মানবিক বার্তাকে শ্রদ্ধা জানায়।
এই ইতিহাস জানলে মাথা একটু উঁচু করে বলা যায়—হ্যাঁ, আমরা এমন একজন মানুষের উত্তরাধিকার বহন করি, যাঁর নাম গোটা বিশ্ব সম্মানের সঙ্গে উচ্চারণ করে।


