শিল্পের মহাসম্রাট এসএম সুলতান
বাংলাদেশের চিত্রকলার ইতিহাসে যে ক’জন শিল্পী কালোত্তীর্ণ অবদান রেখে গেছেন, এসএম সুলতান তাঁদের মধ্যে অন্যতম। বাঙালি জাতিসত্তার অন্তর্গত শিল্পবোধকে তিনি তুলির আঁচড়ে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছেন। শুধু রঙ-তুলির মাধ্যমে সৌন্দর্য সৃষ্টিই নয়, প্রকৃতি ও মানবিকতার প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধ তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
ঢাকার ফুটপাতে দুর্লভ নাগালঙ্গম বৃক্ষ নিধন দেখে তাঁর চোখ ভিজে উঠেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন—একটি গাছের মৃত্যু মানেই পুরো জীবনের সমাপ্তি। নড়াইলের মানুষের কাছে তিনি “লাল মিয়া” নামে পরিচিত ছিলেন। আজ তাঁর ১০১তম জন্মদিন—যা শুধু নড়াইল নয়, সমগ্র বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক শিল্পজগতে গর্বের দিন।
শৈশব ও শিক্ষাজীবনের শুরু
১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের চিত্রা নদীর তীরে সবুজ শ্যামল গ্রামের মধ্যে জন্ম নেন শেখ মোহাম্মদ সুলতান। বাবা মোঃ মেছের আলি এবং মা মোছাঃ মাজু বিবি স্নেহভরে ডাকনাম রেখেছিলেন “লাল মিয়া”। দারিদ্র্যের মাঝেই বেড়ে ওঠা এই প্রতিভাবান শিশু ১৯২৮ সালে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন।
ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি ঝোঁক ছিল তাঁর। ১৯৩৩ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালীন জমিদার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি এঁকে সবার নজর কাড়েন। ১৯৩৮ সালে পড়াশোনা ছেড়ে চলে যান কলকাতায়, যেখানে চিত্রসমালোচক শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সহযোগিতায় ভর্তি হন কলকাতা আর্ট স্কুলে (১৯৪১)।
বিশ্বমঞ্চে শিল্পযাত্রা
১৯৪৪ সালে কলকাতা আর্ট স্কুল ত্যাগ করে কাশ্মীরের পাহাড়ে উপজাতিদের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন এবং তাঁদের জীবনভিত্তিক ছবি আঁকেন। ১৯৪৬ সালে ভারতের সিমলায় প্রথম একক চিত্রপ্রদর্শনী করেন। ১৯৪৮ সালে লাহোরে তাঁর চিত্রপ্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন ফাতিমা জিন্নাহ।
১৯৫০ সালে পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আমেরিকা যান আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে যোগ দিতে। ইউরোপ সফরে তাঁর চিত্রকর্ম পিকাসো, সালভেদর দালি, পল ক্লী প্রমুখ বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের কাজের পাশে স্থান পায়—যা ছিল এশিয়ার একজন শিল্পীর জন্য বিরল গৌরব।
নড়াইল ফিরে আসা ও শিল্পশিক্ষা বিস্তার
১৯৫৩ সালে নড়াইলে ফিরে এসে শিশু-কিশোরদের সাধারণ ও চারুকলা শিক্ষার উদ্যোগ নেন। ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন “দি ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্টস” এবং ১৯৮৭ সালে স্বপ্নের “শিশুস্বর্গ”। তাঁর ইচ্ছা ছিল শিশুদের সৃজনশীল বিকাশের জন্য একটি অনন্য পরিবেশ গড়ে তোলা।
শিল্প ও সৃজনশীলতা
তাঁর বিখ্যাত চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে—“পাট কাটা”, “ধানকাটা”, “জমি কর্ষণে যাত্রা”, “মাছ ধরা”, “শাপলা তোলা” প্রভৃতি। গ্রামীণ জীবনের ঘাম, মাটি ও প্রকৃতির সান্নিধ্য তাঁর ক্যানভাসে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
এছাড়া তিনি বাঁশি ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন এবং সাপ, ভল্লুক, বানর, ময়না, ষাঁড়সহ নানা প্রাণী পালন করতেন। হিংসা ও বিদ্বেষ তাঁর জীবনে স্থান পায়নি।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
- ১৯৮২: একুশে পদক
- ১৯৮৪: রেসিডেন্ট আর্টিস্ট
- ১৯৮৬: বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা
- ১৯৯৩: স্বাধীনতা পদক
- আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের “ম্যান অব দ্য ইয়ার”, নিউইয়র্ক বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টারের “ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট”, এশিয়া উইকের “ম্যান অব এশিয়া”।
চিরনিদ্রায় শিল্পসাধক
১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁকে সমাহিত করা হয় নড়াইলের জন্মভূমিতে।
সুলতান স্মৃতি ও পর্যটন সম্ভাবনা
তাঁর বাসভবনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে সুলতান স্মৃতিসংগ্রহশালা, শিশুস্বর্গ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। চিত্রা নদীর পাড়ে তাঁর ভ্রাম্যমাণ শিশুস্বর্গ নৌকাঘাট সংস্কার করা হয়েছে। সুলতানপ্রেমীরা এলাকাটিকে আরো পর্যটনবান্ধব করার দাবি জানাচ্ছেন। জেলা প্রশাসনও পর্যটন উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
জন্মদিনের বিশেষ আয়োজন
আজ তাঁর ১০১তম জন্মদিন উপলক্ষে কোরআন খতম, কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিল ও নানা সাংস্কৃতিক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে—যেখানে শিল্পপ্রেমীরা শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন বাংলার এই মহাশিল্পীকে।
এসএম সুলতান শুধু একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলার শিল্প, সংস্কৃতি ও মানবতার জীবন্ত প্রতীক। তাঁর সৃষ্টিকর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চিরকাল অনুপ্রেরণা দিয়ে যাবে।


