শিল্পাচার্য এস. এম. সুলতান—বাংলার শিল্প জগতের এক অবিস্মরণীয় নাম, যিনি শুধু ক্যানভাসে নয়, জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে ভালোবাসা, মমতা এবং মানবতার অমলিন স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তিনি ছিলেন এক প্রকৃতি-প্রেমী, এক শিশুপ্রেমী মহামানব এবং একইসাথে এক অদম্য শিল্পসাধক। তাঁর শিল্পে যেমন ফুটে উঠেছে গ্রামীণ জীবনের অপার সৌন্দর্য, তেমনি তাঁর হৃদয়ে ছিল প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি অপরিসীম মায়া।
১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট, নড়াইলের মাসিমদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সুলতান। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন রঙ ও ছবির প্রতি অদ্ভুত টান অনুভবকারী। ক্যানভাসে মানুষের শ্রম, গ্রামীণ জীবনের দৃঢ়তা এবং প্রকৃতির অপরূপ রূপ ফুটিয়ে তোলাই ছিল তাঁর আজীবন সাধনা।
কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ এবং প্রকৃতির দৃশ্য—এসব তাঁর চিত্রকলার কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর তুলির আঁচড়ে উঠে আসত শক্তিশালী দেহের গ্রামীণ মানুষ, যাদের চোখে-মুখে লুকিয়ে থাকত সংগ্রামের গল্প।
সুলতান শুধু আঁকার মানুষ নন, তিনি ছিলেন প্রকৃতির অভিভাবক। ঢাকার ফুটপাথে দুর্লভ নাগালঙ্গম বৃক্ষের নিধন দেখে তাঁর চোখ ভিজে উঠেছিল। তিনি বলেছিলেন—“এ কেবল একটি বৃক্ষের পতন নয়, এ যেন সমগ্র জীবনের অন্তিম সুর।”
এই একটি বাক্যই প্রকাশ করে তাঁর গভীর পরিবেশচেতনা। তিনি বিশ্বাস করতেন, বৃক্ষ ও প্রকৃতি রক্ষা করা মানেই জীবন রক্ষা করা।
সুলতানের জীবনের অন্যতম বড় কাজ ছিল “শিশুস্বর্গ” প্রতিষ্ঠা। নড়াইলের এই শিশুস্বর্গ ছিল গ্রামীণ শিশুদের জন্য এক মুক্তশিক্ষার ক্ষেত্র। এখানে কোনো আনুষ্ঠানিক শ্রেণি-পাঠ ছিল না, বরং ছিল সৃজনশীল শিক্ষার পরিবেশ, যেখানে শিশুরা প্রকৃতির সান্নিধ্যে বড় হয়ে উঠত।
তিনি নিজের সব অর্থ, শ্রম ও সময় উজাড় করে দিয়েছিলেন শিশুদের কল্যাণে। তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শিশুস্বর্গ ছিল তাঁর হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের স্বপ্ন।
সুলতানের জীবনের অন্তিম দিনে এক নিবেদিত প্রাণ সঙ্গী ছিলেন নিহার বালা। মৃত্যুর আগের দিন তিনি নিহার বালার হাত ধরে বলেছিলেন—“আপনি থাকলেন, আর আমার শিশুস্বর্গ রইল। শিশুস্বর্গ যেন বেঁচে থাকে। আপনি দেখবেন, দেখে রাখবেন তো?”
এই অঙ্গীকারের প্রতিদান হিসেবে নিহার বালা আজীবন শিশুস্বর্গের প্রহরী হয়ে থেকেছেন, যেন এই আলোকশিখা কখনো নিভে না যায়।
সুলতানের চিত্রকর্মের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল—তাঁর ছবিতে গ্রামের কৃষক, জেলে, দিনমজুরদের দৃঢ় দেহকাঠামো, তেজস্বী মুখচ্ছবি। তাঁর ছবিতে পেশির বলিষ্ঠতা শুধু শারীরিক শক্তির নয়, বরং সংগ্রামী চেতনার প্রতীক।
শিল্পী হিসেবে তিনি শুধু বাংলাদেশেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সম্মানিত হন। তাঁর ছবি লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, লাহোর, কলকাতা, করাচি সহ বহু শহরে প্রদর্শিত হয়েছে। তিনি একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারসহ বহু সম্মান অর্জন করেন।
সুলতানের ক্যানভাসে সবুজ ধানের ক্ষেত, নদী, নৌকা, কৃষকের ঘাম—সবকিছু জীবন্ত হয়ে উঠত। তাঁর শিল্পকর্ম শুধু দৃশ্যপট নয়, ছিল জীবনের গল্প।
শিল্পাচার্য সুলতান আমাদের শিখিয়েছেন—শিশুদের প্রতি বিন্দুমাত্র দ্বিধাহীন ভালোবাসা,প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি গভীর মমতা,শিল্পের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের পথ দেখানো।
আজও নড়াইলের শিশুস্বর্গ, তাঁর আঁকা ছবি এবং তাঁর বলা কথা আমাদের অনুপ্রাণিত করে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—প্রকৃতি, মানুষ ও শিল্প একে অপরের পরিপূরক।
শিল্পাচার্য এস. এম. সুলতান শুধু একজন শিল্পী নন—তিনি ছিলেন মানবতা, শিল্প এবং প্রকৃতির দূত। তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে আমরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং সেই সাথে স্মরণ করি নিহার বালাকে, যিনি সুলতানের স্বপ্নের আলো ধরে রেখেছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম।


