ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হামলা এবং সেদেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক গ্রেপ্তারের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাজনীতি, কূটনীতি আর সামরিক শক্তির এই সংঘাতে এবার প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠল কবিতা। মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সরব হলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের পুরনো এক প্রতিবাদী কবিতা শেয়ার করে তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন— “কবে তোমার সন্ত্রাস বন্ধ করবে তুমি আমেরিকা?”
গভীর রাতে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা
লাতিন আমেরিকার বামপন্থী ও তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলায় স্থানীয় সময় শুক্রবার গভীর রাতে অতর্কিতে হামলা চালায় মার্কিন ডেল্টা ফোর্স। সেই অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফোরসকে গ্রেপ্তার করা হয়। মাদক পাচারসহ একাধিক অপরাধমূলক অভিযোগে তাঁদের নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসন স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, মাদুরোর বিচার হবে আমেরিকার মাটিতেই। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক তৈরি হলেও, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের অবস্থান নিয়ে একচুলও নড়েননি। বরং তিনি প্রকাশ্যেই এই অভিযানের পক্ষে সওয়াল করেছেন।
রাজনীতির বাইরে সাহিত্যিক প্রতিবাদ
এই ঘটনার পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় আলোচনা, ক্ষোভ আর প্রতিবাদ। ঠিক সেই সময়ই নিজের কণ্ঠস্বর তুলে ধরলেন তসলিমা নাসরিন। শনিবার সকাল থেকে ঘটনার পরম্পরা লক্ষ্য করে তিনি ফেসবুকে পোস্ট করেন একটি পুরনো কবিতা। কবিতার মধ্য দিয়েই মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ধিক্কার জানান তিনি।
তসলিমার এই প্রতিবাদ শুধু একটি রাজনৈতিক মন্তব্য নয়, বরং মানবতার পক্ষ থেকে উঠে আসা এক দীর্ঘ আর্তনাদ। শক্তিশালী রাষ্ট্রের হাতে দুর্বল দেশগুলোর বারবার লাঞ্ছিত হওয়ার ইতিহাসই তাঁর কবিতার মূল সুর।
কবিতার নামেই স্পষ্ট লক্ষ্য: ‘আমেরিকা’
তসলিমা নাসরিন যে কবিতাটি শেয়ার করেছেন, তার নামই ‘আমেরিকা’। নামেই স্পষ্ট, কার দিকে তাঁর আঙুল। কবিতার শুরুতেই তিনি একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন—
“কবে তোমার লজ্জা হবে আমেরিকা?
কবে তোমার চেতন হবে আমেরিকা?
কবে তোমার সন্ত্রাস বন্ধ করবে তুমি আমেরিকা?
কবে তুমি পৃথিবীর মানুষকে বাঁচতে দেবে আমেরিকা?
কবে তুমি মানুষকে মানুষ বলে মনে করবে আমেরিকা?
কবে এই পৃথিবীটাকে টিকে থাকতে দেবে আমেরিকা?”
এই প্রশ্নগুলো শুধু একটি দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং ক্ষমতার দম্ভ আর যুদ্ধের রাজনীতির বিরুদ্ধেই এক তীব্র প্রতিবাদ।
ধ্বংস, মৃত্যু আর ভাঙা সভ্যতার ছবি
কবিতার পরের অংশে তসলিমা তুলে ধরেছেন মার্কিন সামরিক অভিযানের ভয়াবহ চিত্র। বোমায় ঝরে যাওয়া প্রাণ, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া শহর, ভেঙে পড়া সভ্যতা আর হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্বপ্ন— সবকিছুরই উল্লেখ রয়েছে তাঁর লেখায়।
তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে একের পর এক দেশ মার্কিন আগ্রাসনের শিকার হয়ে ছিন্নভিন্ন হয়েছে। যুদ্ধ শুধু একটি ভূখণ্ড দখলের গল্প নয়, এটি হাজার হাজার সাধারণ মানুষের জীবন ধ্বংস করে দেয়— সেই কথাই কবিতার ছত্রে ছত্রে উঠে এসেছে।
অনুশোচনার আহ্বান, নাকি তীব্র ধিক্কার?
কবিতার আরেক অংশে তসলিমা আমেরিকার কাছে অনুশোচনার দাবি জানিয়েছেন। তবে সেই অনুশোচনা কোনো নরম ভাষায় নয়, বরং তীক্ষ্ণ ও কঠোর শব্দে—
“কবে তুমি অনুতপ্ত হবে আমেরিকা?
কবে তুমি সত্য বলবে, আমেরিকা?
কবে তুমি মানুষ হবে আমেরিকা?
কবে তুমি কাঁদবে আমেরিকা?
কবে তুমি ক্ষমা চাইবে আমেরিকা?”
এই প্রশ্নগুলোর পরেই আরও কঠিন হয়ে ওঠে তাঁর ভাষা। তিনি লেখেন, আমেরিকার দিকে ঘৃণা ছুড়ে দেওয়া হবে, এবং যতদিন না এই আগ্রাসন বন্ধ হচ্ছে, ততদিন সেই ঘৃণা ছোড়া চলতেই থাকবে।
একের পর এক দেশের নাম, দীর্ঘ ক্ষোভের তালিকা
তসলিমা নাসরিন তাঁর কবিতায় শুধু ভেনেজুয়েলার কথাই বলেননি। তিনি ইতিহাসের পাতা উল্টে এনে একের পর এক দেশের নাম উচ্চারণ করেছেন, যারা মার্কিন আগ্রাসনের শিকার হয়েছে।
এল সালভাদোর, নিকারাগুয়া, চিলি, কিউবা, পানামা থেকে শুরু করে ইরান, ইরাক, লিবিয়া, মিশর, প্যালেস্টাইন, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান— এই দীর্ঘ তালিকা যেন বিশ্ব রাজনীতির এক রক্তাক্ত মানচিত্র।
এই দেশগুলোর নাম উচ্চারণের মধ্য দিয়েই তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি ধারাবাহিক আগ্রাসনের গল্প।
কবিতার শেষভাগে তীব্রতম ভাষা
কবিতার শেষ অংশে তসলিমার কলম আরও ঝলসে উঠেছে। আমেরিকার প্রতি তাঁর ধিক্কার সেখানে চরম রূপ নেয়। তিনি লেখেন—
“নিজেকে তুমি, এখনও সময় আছে, ঘৃণা করো।
এখনও তুমি তোমার মুখখানা লুকোও দুহাতে।
এখনও তুমি পালাও কোনও ঝাড়–জঙ্গলে।
তুমি গ্লানিতে কুঁকড়ে থাকো,
কুঁচকে থাকো, তুমি আত্মহত্যা করো।”
এই অংশ অনেকের কাছেই চরম মনে হতে পারে। কিন্তু তসলিমার সমর্থকদের মতে, এই তীব্রতাই তাঁর লেখার শক্তি। তিনি নরম করে কথা বলেন না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি বরাবরই কঠোর।
পুরনো কবিতা, কিন্তু আজও প্রাসঙ্গিক
তসলিমা নিজেই জানিয়েছেন, এই কবিতাটি নতুন নয়। এটি বহু বছর আগের লেখা। অনেকের ধারণা, ইরাক বা ইরানে মার্কিন হামলার সময়ই এই কবিতার জন্ম।
তবুও এত বছর পর ভেনেজুয়েলার ঘটনার প্রেক্ষিতে কবিতাটি আবারও সমান প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। এতে একটাই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে— সময় বদলালেও কি মার্কিন আগ্রাসী মনোভাব বদলেছে?
শেষ কথা
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা আবারও প্রমাণ করল, শক্তির রাজনীতিতে মানবতা কতটা অসহায়। সেই বাস্তবতার বিরুদ্ধেই কবিতার ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন তসলিমা নাসরিন।
রাজনীতিবিদরা যখন কূটনৈতিক ভাষায় কথা বলেন, তখন কবিরা প্রশ্ন করেন বিবেক দিয়ে। “কবে তোমার সন্ত্রাস বন্ধ করবে তুমি আমেরিকা?”— এই প্রশ্ন শুধু একটি দেশের জন্য নয়, বরং গোটা বিশ্বের বিবেকের কাছেই ছুড়ে দেওয়া এক কঠিন প্রশ্ন।


