যশোর জেলার বাঘারপাড়ার এক নিবিড় গ্রাম জহুরপুর। একদিক দিয়ে চিত্রা নদী, অন্যদিকে অনন্ত সবুজ ধানক্ষেত, মাঝ দিয়ে চলে গেছে একটি সরু পিচঢালা পথ। সেই পথ ধরে এগোতে এগোতে পৌঁছানো যায় জহুরপুর রামগোপাল বহুমুখী বিদ্যালয় পর্যন্ত। আর এই বিদ্যালয়ের মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল বটগাছ, শতাব্দীর সাক্ষী হয়ে, ছায়ার মতন শান্তি বিলিয়ে। তার অস্তিত্ব যেন বলে— “আমার ছায়ায় ক্লান্তি হারিয়ে যাক।”
জহুরপুর গ্রাম: যেখানে সময় থেমে থাকে
জহুরপুর শুধু একটি গ্রামের নাম নয়, বরং এটি এক গ্রামীণ সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি। গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু সেই প্রাচীন বটগাছটি। বছরের পর বছর ধরে এ গাছ তার অস্তিত্বের জানান দিয়ে আসছে, শতশাখা ডালপালায় ছড়িয়ে দিচ্ছে এক নির্মল প্রশান্তি।
প্রতিটি সকালে সূর্যের কিরণ গাছের পাতায় আলো-ছায়ার এক অপূর্ব খেলা তৈরি করে। গ্রীষ্মকালীন প্রখর রোদ, বর্ষার মেঘমলা, শীতের কুয়াশা কিংবা বসন্তের কোমল বাতাস—সব ঋতুতে এই বটগাছ এক শান্ত নির্জনতার ঠিকানা।
বটগাছ: জহুরপুরের নীরব পাহারাদার
এই গাছটি শুধু একটি বৃক্ষ নয়, এটি এক জীবন্ত ইতিহাস। অগণিত শিকড় তার মাটির গভীরে প্রবেশ করে যেন ধরাকে আঁকড়ে ধরেছে। বিস্তৃত ডালপালা যেমন ছায়া দেয়, তেমনই তা হয়ে ওঠে পাখিদের বাসস্থান।
প্রতিদিন ভোরবেলা শুরু হয় নানা রঙের পাখির কিচিরমিচির কলতানে। বিশেষ করে যখন বটফল ধরে, তখন তা হয়ে ওঠে একটি প্রাকৃতিক আকর্ষণের কেন্দ্র। দোয়েল, বুলবুলি, শালিক থেকে শুরু করে নাম না জানা অনেক পাখি এসে ভিড় করে এই গাছে। গাছ যেন হয়ে ওঠে এক জীবন্ত সঙ্গীতের মঞ্চ।
বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে বটগাছ: শিক্ষার পাশাপাশি সংস্কৃতি
জহুরপুর রামগোপাল বহুমুখী বিদ্যালয় গ্রামের শিশুদের শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি এই বটগাছের ছায়ায় সৃষ্টি করেছে এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। প্রতিদিন স্কুল ছুটির পরে শিক্ষার্থীরা গাছের নিচে বসে গল্প করে, খেলাধুলা করে। বয়স্করা সেখানে বসে আড্ডায় মেতে ওঠেন, কেউ কেউ প্রার্থনা করেন, আবার কেউ চুপচাপ প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটান।
গাছটি যেন সমস্ত গ্রামবাসীর অনুভবের কেন্দ্রবিন্দু। একটি সাধারণ বৃক্ষ হয়েও সে হয়ে উঠেছে মানবিক সংযোগের প্রতীক।
ভোরের হাওয়া, শিশিরভেজা সকাল
যদি কেউ জহুরপুরের কোনো সকালে সেই বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে বুঝতে পারবে এক অপরূপ অভিজ্ঞতা কীভাবে হৃদয় ছুঁয়ে যায়। শিশিরভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটার সময় পায়ের নিচে এক কোমল ঠাণ্ডা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। গাছের পাতায় ঝিরঝির বাতাসের শব্দ যেন চুপিচুপি বলে যায় এক অনন্ত কাব্য।
এক নিরিবিলি সকালে গ্রামের কয়েকজন বৃদ্ধ এসে বসে পড়েন গাছের নিচে, কথা বলেন না, কিন্তু তাদের নীরবতায় মিশে থাকে ইতিহাস, অভিজ্ঞতা আর ভালোবাসা। গাছটি যেন শ্রোতা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, শুনে চলে সব কিছু।
বটগাছের ছায়ায় ক্লান্তির বিশ্রাম
বটগাছটি যেমন প্রাকৃতিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এটি এক নান্দনিক বিশ্রামের জায়গা। কৃষকেরা মাঠে কাজ শেষ করে আসেন এই গাছের নিচে, পথিকেরা কয়েক মুহূর্ত বসে নেন একটু প্রশান্তি, যুবকেরা এখানে বসে স্বপ্ন দেখে।

এমন একটা ছায়া যাকে একবার কেউ অনুভব করলে, তার মনের ভেতর গেঁথে যাবে চিরকাল। এই বটগাছ যেন নিজের অস্তিত্ব দিয়ে বুঝিয়ে দেয়—
“সব কিছু বদলালেও কিছু স্থান, কিছু গাছ, কিছু অনুভব বদলায় না”।
কিভাবে যাবেন জহুরপুরে?
যদি আপনি যশোর শহর থেকে রওনা দেন, তাহলে প্রথমেই যেতে হবে খাজুরা বাজার। সেখান থেকে চিত্রা নদী পার হয়ে পাওয়া যাবে রিকশা ভ্যান, বাইক বা সিএনজি। সরু পাকা রাস্তা পেরিয়ে ধানক্ষেতের মাঝ দিয়ে এগিয়ে গেলেই পৌঁছে যাবেন জহুরপুর রামগোপাল বিদ্যালয়ের মাঠে।
সকাল কিংবা বিকেলের সময় গেলে সবচেয়ে ভালো অভিজ্ঞতা হবে। সূর্যের আলো ও ছায়ার খেলা, পাখির গান এবং হালকা বাতাস আপনার মন ছুঁয়ে যাবে।
কিছু কথা মনে রাখবেন
- বটগাছটিকে যেন কেউ কোনোভাবে ক্ষতি না করে।
- এটি শুধু একটি গাছ নয়, গ্রামের আত্মা।
- এমন গাছ আমাদের পরিচয় ও অতীতকে ধারণ করে।
জহুরপুরে একবার গেলে মনে গেঁথে যাবে
জহুরপুরের এই বটগাছ কেবল ছায়া দেয় না, দেয় অভিজ্ঞতা, শান্তি, ইতিহাস। আপনি যদি কখনো নগরের কোলাহল থেকে একটু দূরে যেতে চান, তবে এই গাছের নিচে বসে এক কাপ চা পান করুন—আপনি বুঝবেন জীবন আসলে কতটা সহজ, কতটা প্রকৃতির কাছে থাকা যায়।
এই গাছ যেন বলেই চলে—
“তুমি ফিরে এসো, বারবার ফিরে এসো আমার ছায়ায়…”


