যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং স্বাস্থ্যসেবা ও সমাজকল্যাণে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। এর অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ হলো যবিপ্রবি ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, দক্ষ ফিজিওথেরাপিস্ট এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে এই সেন্টার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হাজারো মানুষের জন্য আশার আলো হয়ে উঠেছে। স্বল্প ব্যয়ে মানসম্মত ফিজিওথেরাপি সেবা দিয়ে কেন্দ্রটি আজ মানুষের আস্থার জায়গা তৈরি করেছে।
যবিপ্রবিতে ফিজিওথেরাপি শিক্ষা ও সেবার যাত্রা
২০১৮ সালে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি পর্যায়ে প্রথমবারের মতো ব্যাচেলর অব ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম চালু হয়। একই সঙ্গে যাত্রা শুরু করে ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার। বিভাগের সিনিয়র প্রভাষক ড. কাজী এমরান হোসেন জানান, শুরু থেকেই এই সেন্টারের লক্ষ্য ছিল শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ইউনিটে পরিণত হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন সেবা
বর্তমানে যবিপ্রবি ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে নানামুখী আধুনিক চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। টেকনিক্যাল অফিসার ডা. মো. কবির হোসেনের মতে, এখানে নিয়মিত আউটডোর ফিজিওথেরাপি সেবা, স্ট্রোক ও নিউরোলজিক্যাল রিহ্যাবিলিটেশন, কোমর, ঘাড়, হাঁটু ও বিভিন্ন জয়েন্টের ব্যথা চিকিৎসা করা হয়। পাশাপাশি শিশুদের জন্য পিডিয়াট্রিক ফিজিওথেরাপি, খেলোয়াড়দের জন্য স্পোর্টস ইনজুরি রিহ্যাবিলিটেশন এবং আধুনিক মাস্কুলোস্কেলিটাল থেরাপি সেবা চালু রয়েছে। এসব সেবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য ঢাকামুখী চিকিৎসা নির্ভরতা কমিয়ে দিয়েছে।
স্ট্রোক ও নিউরোলজিক্যাল রোগীদের আশার ঠিকানা
স্ট্রোক ও জটিল নিউরোলজিক্যাল সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য এই সেন্টার বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। সিনিয়র ফিজিওথেরাপিস্ট ও সিনিয়র প্রভাষক ড. তোফাজ্জল হোসাইন বলেন, আন্তর্জাতিক মানের থেরাপি প্রয়োগের মাধ্যমে রোগীদের দ্রুত সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। নিয়মিত থেরাপি ও ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা পরিকল্পনার কারণে অনেক রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারছেন।
বাস্তব অভিজ্ঞতা: রোগীদের কণ্ঠে সাফল্যের গল্প
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার স্ট্রোক রোগী আব্দুল মাজেদের পরিবার এই সেন্টারের সেবায় নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে। তাঁর স্বজন আমিনুর রহমান বলেন, ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের ছিল না। যবিপ্রবি ফিজিওথেরাপি সেন্টারে নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়ার ফলে তাঁর বাবার হাত-পা আবার নড়াচড়া করতে শুরু করেছে। এই সেন্টার তাদের কাছে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।
গ্রাম-গঞ্জে ফ্রি ফিজিওথেরাপি হেলথ ক্যাম্প
যবিপ্রবি ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের কার্যক্রম শুধু বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে সীমাবদ্ধ নয়। সহকারী অধ্যাপক ড. শর্মিলা জাহান জানান, নিয়মিতভাবে গ্রামে-গঞ্জে বিনামূল্যে ফিজিওথেরাপি হেলথ ক্যাম্প আয়োজন করা হচ্ছে। এসব ক্যাম্পে স্ট্রোক রোগী, বয়স্ক মানুষ, কৃষক ও শ্রমজীবীদের বিনা খরচে চিকিৎসা, ব্যায়াম পরামর্শ ও সচেতনতা প্রদান করা হয়। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন।
রোগী নয়, মানুষ হিসেবে চিকিৎসা
ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. এহসানুর রহমান বলেন, এই সেন্টারের লক্ষ্য শুধু রোগ নিরাময় নয়। রোগীদের স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনে ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য। মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়, যা এই সেন্টারকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
হাতে-কলমে দক্ষ ফিজিওথেরাপিস্ট তৈরির কেন্দ্র
এই সেন্টার শুধু রোগীদের জন্য নয়, ভবিষ্যতের দক্ষ ফিজিওথেরাপিস্ট তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান ড. ফিরোজ কবির বলেন, এখানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা বাস্তব রোগী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক গুণাবলি অর্জন করছে, যা তাদের দেশসেবায় আরও কার্যকর করে তুলছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমাজসেবার সমন্বয়
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আব্দুল মজিদ বলেন, যবিপ্রবি শিক্ষা ও সমাজসেবার সমন্বয়ে এগিয়ে যেতে চায়। ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ভবিষ্যতে এই সেন্টারের পরিসর ও সেবার মান আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সমাজের চোখে যবিপ্রবি ফিজিওথেরাপি সেন্টার
যশোরের বিশিষ্ট সাংবাদিক সোহরাব হোসেনের মতে, যবিপ্রবি ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার প্রমাণ করেছে সঠিক পরিকল্পনা ও মানবিক উদ্যোগ থাকলে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও মানুষের ভরসাস্থল হতে পারে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সমাজসেবার সমন্বয়ে এই সেন্টারের অবদান আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হবে বলে তিনি আশাবাদী।
মানুষের পাশে থাকা এক অনন্য উদ্যোগ
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার আজ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য শুধু একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নয়, বরং ভরসা, আস্থা ও নতুন জীবনের প্রতীক। আধুনিক ফিজিওথেরাপি সেবা, মানবিক আচরণ এবং সমাজমুখী কার্যক্রমের মাধ্যমে এই সেন্টার দেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভবিষ্যতে এর পরিধি আরও বিস্তৃত হয়ে আরও বেশি মানুষের জীবন বদলে দেবে—এমন প্রত্যাশাই সবার।


