যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সংক্ষেপে যবিপ্রবি। যশোরের মানুষের কাছে এটা শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং গর্বের নাম। দুই দশকের পথচলায় এই বিশ্ববিদ্যালয় আজ নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। সেই গর্বের ইতিহাস উদযাপন করতেই নানা আয়োজনে পালিত হলো যবিপ্রবির ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দিনভর ছিল উৎসবের আমেজ, আনন্দ আর সাফল্যের গল্প।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সকালটা শুরু হয় একেবারে নিয়মমাফিক ও গাম্ভীর্যের সঙ্গে। সকাল ১০টায় প্রশাসনিক ভবনের সামনে মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মজিদ জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। একই সময়ে রিজেন্ট বোর্ডের সম্মানিত সদস্য অধ্যাপক ড. এইচ. এম. জাকির হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলন করেন। এই মুহূর্তেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের কর্মসূচি।
সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধান ফটক থেকে বের হয় বর্ণিল আনন্দ শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রায় অংশ নেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। রঙিন ব্যানার, ফেস্টুন আর মুখভরা হাসিতে পুরো ক্যাম্পাস যেন অন্য রূপ নেয়। শোভাযাত্রা শেষ হয় মূল অনুষ্ঠানস্থলে এসে।
শোভাযাত্রা শেষে আয়োজন করা হয় আলোচনা সভা, বেলুন উড়ানো ও কেক কাটার অনুষ্ঠান। মাননীয় উপাচার্য কেক কেটে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এই সময় পুরো প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দ আর উচ্ছ্বাস।

এরপর যবিপ্রবির উপাচার্য এবং গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হোসেন উদ্দিন শেখরসহ অন্যান্য অতিথিরা জুলাই কর্ণার উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর অতিথিদের সঙ্গে নিয়ে উপাচার্য বিভিন্ন বিভাগের পিঠা উৎসবের স্টল, পথ আল্পনা ও পোস্টার প্রেজেন্টেশন ঘুরে দেখেন।
স্টলগুলোতে ছিল নানা ধরনের পিঠা। কোনোটা গোল, কোনোটা লম্বা, কোনোটা আবার রঙিন নকশায় সাজানো। শীতের ঐতিহ্যবাহী পিঠার এই আয়োজন সবাইকে মুগ্ধ করে। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা এখানে স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মজিদ। তিনি বলেন, যবিপ্রবির বয়স কম হলেও এর অর্জন অনেক বড়। শিক্ষা ও গবেষণায় এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অনেক পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়কেও পেছনে ফেলেছে। বিশ্ব র্যাংকিংয়ে জায়গা করে নিয়ে যবিপ্রবি দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে আধুনিক গবেষণাগার, উন্নত আবাসন ব্যবস্থা, পড়ালেখার সুন্দর পরিবেশ এবং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জিমনেসিয়াম। শিক্ষা, গবেষণা ও ক্রীড়াকে আরও এগিয়ে নিতে জমি অধিগ্রহণ খুবই জরুরি। এ জন্য ইউজিসিতে ডিপি জমা দেওয়া হয়েছে। সরকার এই প্রয়োজন বুঝে সহযোগিতা করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উপাচার্য তাঁর বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা দিন-রাত পরিশ্রম করে আল্পনা, পিঠা স্টল ও নানা আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। গবেষণার পাশাপাশি তাদের এই সৃজনশীলতা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। এই বিশ্ববিদ্যালয় দিবস তারই প্রমাণ।
ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক ড. মো. রাফিউল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন গোবিপ্রবির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. সোহেল হাসান। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন যবিপ্রবি রিজেন্ট বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ড. এইচ. এম. জাকির হোসেন, অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক, সহযোগী অধ্যাপক ড. মোছা. আফরোজা খাতুন, ডিনস কমিটির আহ্বায়ক ড. মো. কোরবান আলী, ডিন অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম, প্রক্টর অধ্যাপক ড. এস. এম. নূর আলমসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. শাহনূর রহমান।
বিকেলে আয়োজন করা হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমন্ত্রিত শিল্পীরা গান ও পরিবেশনায় মাতিয়ে তোলেন দর্শকদের। দেশীয় লোকসংগীত থেকে শুরু করে ব্যান্ড পরিবেশনা, সব মিলিয়ে বিকেলটা হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
উচ্চ শিক্ষার মাধ্যমে আধুনিক জ্ঞান চর্চা ও গবেষণার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে ২০০৭ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের সাজিয়ালী মৌজায় ৩৫ একর জমির ওপর যবিপ্রবি প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুটা ছিল ছোট পরিসরে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয় দ্রুত এগিয়েছে।

বর্তমানে যবিপ্রবিতে আটটি অনুষদের অধীনে ২৭টি বিভাগ রয়েছে। স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল ও পিএইচডি পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন প্রায় ৪ হাজার ২৩১ জন শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের পথচলায় পাশে আছেন ৩৪৫ জন শিক্ষক। পাশাপাশি ১৬২ জন কর্মকর্তা ও ৩৪৪ জন কর্মচারী বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম সচল রাখতে নিরলসভাবে কাজ করছেন।
২০ বছরের এই যাত্রা যবিপ্রবির জন্য শুধু অতীত নয়, ভবিষ্যতের জন্যও এক শক্ত ভিত। শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে এই বিশ্ববিদ্যালয় আরও দূর যাবে, এমনটাই প্রত্যাশা সবার। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আয়োজন যেন সেই প্রত্যাশাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।
যবিপ্রবি আজ শুধু যশোরের নয়, সারা বাংলাদেশের গর্ব। দুই দশকের অর্জন পেছনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়টি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে আরও বড় স্বপ্ন নিয়ে।


