ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প এখন আর শুধু ওষুধ উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গবেষণা, উদ্ভাবন, মান নিয়ন্ত্রণ, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, এমনকি ডাটা অ্যানালাইসিস পর্যন্ত এই খাতের পরিধি বিস্তৃত। এই বাস্তবতা সামনে রেখে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যবিপ্রবি) সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার, যা শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও ক্যারিয়ার উন্নয়নের বিষয়ে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে গবেষণা ও ক্যারিয়ার উন্নয়ন বিষয়ে সেমিনার
ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে গবেষণার সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে যবিপ্রবিতে আয়োজিত হয় “রিসার্চ অপর্চুনিটিস অ্যান্ড ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট ইন ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিস” শীর্ষক সেমিনার। সোমবার (২২ ডিসেম্বর) বিকাল ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম একাডেমিক ভবনের অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফ হোসেন গ্যালারিতে এই আয়োজন সম্পন্ন হয়।
রসায়ন বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনারে অংশ নেন বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল বাস্তব অভিজ্ঞতা, ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা এবং ক্যারিয়ার গঠনের বাস্তব আলোচনা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ক্যারিয়ার পরিকল্পনার গুরুত্ব
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আব্দুল মজিদ। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে সহজ ভাষায় ক্যারিয়ার পরিকল্পনার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে বাস্তব জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—একটি পরিকল্পনার ওপর নির্ভর না করে বিকল্প পথ তৈরি রাখা।
তিনি বলেন, এ ধরনের সেমিনার থেকে পাওয়া জ্ঞান ফার্মাসিউটিক্যাল জগৎ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের বাস্তব ধারণা দেবে। ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প একটি বিশাল সেক্টর, যেখানে গবেষণা থেকে শুরু করে উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত নানা সুযোগ রয়েছে। তাই ক্যারিয়ার উন্নয়নের জন্য একাধিক পরিকল্পনা থাকা জরুরি। একটি পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে অন্যটি যেন সামনে থাকে—এই মানসিকতা গড়ে তুলতে তিনি শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানান।
ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে গবেষণার বাস্তব চিত্র
সেমিনারের মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ হেলথ কেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সহকারী ব্যবস্থাপক মো. আব্দুল আলিম। তিনি স্লাইড উপস্থাপনার মাধ্যমে ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে গবেষণার বাস্তব সুযোগগুলো তুলে ধরেন।
তার আলোচনায় গবেষণার বিভিন্ন ধাপ, নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের প্রক্রিয়া, মান নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্পভিত্তিক গবেষণার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে উঠে আসে। তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং দক্ষ গবেষকের চাহিদাও বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা যদি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই গবেষণামুখী চিন্তা করে, তাহলে ভবিষ্যতে এই শিল্পে নিজেদের জায়গা তৈরি করা অনেক সহজ হবে।
শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যারিয়ার গাইডলাইন
সেমিনারে বক্তারা বারবার একটি বিষয় জোর দিয়ে বলেন—শুধু ভালো ফলাফল করলেই ক্যারিয়ার নিশ্চিত হয় না। বাস্তব দক্ষতা, গবেষণার অভিজ্ঞতা এবং শিল্প সম্পর্কে ধারণা থাকাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি ইন্টার্নশিপ, গবেষণা প্রকল্প এবং সেমিনার-ওয়ার্কশপে অংশ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, যারা ল্যাবভিত্তিক কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করে, তারা চাকরির বাজারে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে থাকে।
একাডেমিক ও শিল্পখাতের সংযোগের গুরুত্ব
সেমিনারের সভাপতিত্ব করেন বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. কোরবান আলী। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে সংযোগ যত শক্তিশালী হবে, শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ তত বাড়বে।
এসময় আরও বক্তব্য রাখেন যবিপ্রবির ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আ ফ ম শহীদ-উদ-দৌলা এবং রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কে. এম. আনিস-উল-হক। তাঁরা শিক্ষার্থীদের গবেষণাভিত্তিক পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী হওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, বর্তমান সময় গবেষণাকে আর আলাদা কিছু ভাবার সুযোগ নেই।
শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সুমন চন্দ্র মোহন্ত, সহকারী অধ্যাপক ড. বাবলু হিরা মন্ডল, ড. মো. আজিজুর রহমান খান, ড. মো. শহিদুল ইসলামসহ বিভাগের অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এই সেমিনারে অংশ নেয়।
সেমিনার পরিচালনা করেন রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী জোয়ার্দার জিম। তাঁর সাবলীল উপস্থাপনা পুরো আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষার্থীরা সরাসরি শিল্পখাতের প্রতিনিধি ও শিক্ষকদের কাছে নিজেদের জিজ্ঞাসা তুলে ধরার সুযোগ পায়।
ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প এখন আন্তর্জাতিক বাজারেও পরিচিত। গবেষণাভিত্তিক উৎপাদন বাড়লে এই খাত আরও শক্তিশালী হবে। সেমিনারে আলোচকরা বলেন, আগামী দিনে ফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণায় দক্ষ মানবসম্পদই হবে দেশের বড় শক্তি।
এই ধরনের সেমিনার শিক্ষার্থীদের শুধু তথ্যই দেয় না, বরং আত্মবিশ্বাসও গড়ে তোলে। অনেক শিক্ষার্থী প্রথমবারের মতো বুঝতে পারে, তাদের পড়াশোনার বিষয়টি বাস্তবে কোথায় এবং কীভাবে কাজে লাগানো যায়।
শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার একটি মঞ্চ
সব মিলিয়ে যবিপ্রবিতে আয়োজিত এই সেমিনার ছিল গবেষণা ও ক্যারিয়ার সচেতনতা বৃদ্ধির একটি কার্যকর উদ্যোগ। শিক্ষার্থীরা এখান থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতা, দিকনির্দেশনা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার স্পষ্ট ধারণা পেয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত হলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে আরও বাস্তবভাবে ভাবতে পারবে। ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে গবেষণা ও ক্যারিয়ার উন্নয়নের পথে এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।


