ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবরে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক গভীর শোক আর ক্ষোভের ঢেউ নেমে আসে। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই যবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। রাতের অন্ধকারে ক্যাম্পাসের সড়কগুলো হয়ে ওঠে প্রতিবাদের কণ্ঠে মুখর। শিক্ষার্থীদের এই কর্মসূচি শুধু শোক প্রকাশে সীমাবদ্ধ ছিল না; এতে উঠে আসে দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা এবং বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানের বার্তা।
যবিপ্রবিতে বিক্ষোভ: শোক থেকে প্রতিবাদে রূপ
হাদির মৃত্যুর খবর শোনার পরপরই যবিপ্রবির বিভিন্ন হল ও একাডেমিক ভবন থেকে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে থাকেন। প্রথমে ক্যাম্পাসের ভেতরের সড়ক প্রদক্ষিণ করেন তারা। পরে বিক্ষোভ মিছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এসে যশোর–চৌগাছা সড়কে অবস্থান নেয়। পুরো এলাকা তখন স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে ছিল ক্ষোভ, কণ্ঠে ছিল প্রতিবাদের দৃঢ়তা।
অনেক শিক্ষার্থী বলেন, হাদির মৃত্যু শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যু নয়, এটি দেশের রাজনীতিতে এক গভীর ক্ষতির নাম। তাই এই শোক তারা নীরবে মানতে চাননি। প্রতিবাদের মাধ্যমেই তারা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
বিক্ষোভে উচ্চারিত স্লোগান ও বক্তব্যের মূল সুর
বিক্ষোভ চলাকালে শিক্ষার্থীরা নানা স্লোগান দেন। এসব স্লোগানের মধ্য দিয়ে তারা ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান জানান এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাবের সমালোচনা করেন। “দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা” কিংবা “হাদি ভাই কবরে, খুনি কেন ভারতে?”—এই ধরনের স্লোগান শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের প্রতিফলন হিসেবে শোনা যায়।
একই সঙ্গে তারা ছাত্ররাজনীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দমননীতির বিরুদ্ধেও আওয়াজ তোলেন। স্লোগানগুলো ছিল আবেগী, তবে শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী এগুলোর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা হতাশা ও ক্ষোভ।
সংক্ষিপ্ত সমাবেশ ও শিক্ষার্থীদের বক্তব্য
প্রধান ফটকের সামনে বিক্ষোভ শেষে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা বক্তব্য দেন। ইএসটি বিভাগের মো. ওসামা, জিইবিটি বিভাগের জালিস মাহমুদ, পিইএসএস বিভাগের মো. সাফি এবং আইপিই বিভাগের সিয়াম মিনহাজ তাঁদের বক্তব্যে হাদির মৃত্যু নিয়ে শোক প্রকাশ করেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।
বক্তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সব সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছে। হাদির মৃত্যুর ঘটনাও তার ব্যতিক্রম নয়। তারা মনে করেন, এই মৃত্যু ঘিরে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর স্পষ্ট উত্তর জাতি জানতে চায়।
শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে রাজনৈতিক ক্ষোভ ও ভবিষ্যতের বার্তা
সমাবেশে ইএসটি বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ওসামা বলেন, “বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই এ দেশের ওপর পরিকল্পিত আগ্রাসন চলছে। আমরা ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে তার প্রমাণ দেখেছি। হাদির মৃত্যুও সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলে আমরা মনে করি।”
তিনি আরও বলেন, দেশের যুবসমাজ আর কোনো বিদেশি আধিপত্য মেনে নেবে না। ভবিষ্যতে কেউ যদি বাংলাদেশকে অন্য দেশের প্রভাবাধীন করতে চায়, তবে শিক্ষার্থীরাই প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। তাঁর বক্তব্যে ছিল দৃঢ় আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন।
শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু: সংক্ষিপ্ত পটভূমি
এর আগে, বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তাঁর মৃত্যু সংবাদ দ্রুত দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে।
এনসিপি স্বাস্থ্য সেলের প্রধান এবং হাদির চিকিৎসায় সরাসরি যুক্ত থাকা ডা. আহাদ একটি ভিডিওবার্তায় মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হাদির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া ও শিক্ষার্থীদের ভূমিকা
হাদির মৃত্যুর পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকবার্তা যেমন এসেছে, তেমনি প্রশ্নও উঠেছে তাঁর মৃত্যুর পেছনের বাস্তবতা নিয়ে। যবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ সেই প্রশ্নগুলোকেই আরও জোরালোভাবে সামনে এনেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মনে করেন, সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তরুণদের নীরব থাকা উচিত নয়। ইতিহাসে দেখা গেছে, ছাত্রসমাজ সব সময় পরিবর্তনের অগ্রভাগে থেকেছে। হাদির মৃত্যুর ঘটনায় যবিপ্রবির এই প্রতিবাদ সেই ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা।


