ভারতের সোনার পাহাড়—নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অপার্থিব দৃশ্য। ভোরের আলোয় সোনালি রঙে ঝলমল করা এক বিশাল পাহাড়, যার দিকে তাকিয়ে মানুষ কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। এই পাহাড়টাই কাঞ্চনজঙ্ঘা। পশ্চিমবঙ্গের খুব কাছেই, সিকিম আর নেপালের সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই পাহাড় বাঙালির কাছে শুধু একটি পর্বত নয়, এক গভীর আবেগের নাম।
দার্জিলিং গেলে প্রথম প্রশ্নটাই শোনা যায়—আজ কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাবে তো? কারণ এই পাহাড় দেখার আনন্দ আলাদা। একবার দেখলে মন ভরে না।
কাঞ্চনজঙ্ঘা নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার রহস্য। ‘কাঞ্চন’ মানে সোনা। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, এই পাহাড়ে কোথাও সোনার খনি নেই। তবুও একে ভারতের সোনার পাহাড় বলা হয়। কারণ সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের সময় এই পাহাড় এমন সোনালি রঙ ধারণ করে, যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
ভোরবেলা যখন সূর্যের প্রথম আলো পড়ে পাহাড়ের বরফঢাকা গায়ে, তখন মনে হয় যেন গলানো সোনা ঢেলে দেওয়া হয়েছে। ঠিক সন্ধ্যাতেও একই দৃশ্য। এই রঙের জন্যই পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ একে চেনে ‘গোল্ডেন মাউন্টেন অফ ইন্ডিয়া’ নামে।
অনেকে ভাবেন এই পাহাড় খুব প্রাচীন। আসলে কিন্তু তা নয়। কাঞ্চনজঙ্ঘার বয়স আনুমানিক পাঁচ কোটি বছর। ভারতীয় টেকটনিক প্লেট আর ইউরেশিয়ান টেকটনিক প্লেটের সংঘর্ষ থেকেই এই বিশাল পাহাড়ের জন্ম।
ভাবুন তো, কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর নিচে কী ভয়ানক চাপ আর সংঘর্ষ চলেছে। সেই ধাক্কাতেই ধীরে ধীরে উঠে এসেছে এই পাহাড়। আজ আমরা যাকে সৌন্দর্য বলে দেখি, তার পেছনে লুকিয়ে আছে প্রকৃতির ভয়ংকর শক্তি।
উচ্চতার দিক থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম পাহাড়। এর উচ্চতা প্রায় ২৮ হাজার ১৬৯ ফুট। প্রথমে মাউন্ট এভারেস্ট, তারপর কে-টু, আর তার পরেই কাঞ্চনজঙ্ঘা।
এত উচ্চতা হওয়া সত্ত্বেও এই পাহাড়ের একটা আলাদা কোমলতা আছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কিছুই নয়। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, প্রকৃতি কতটা শক্তিশালী হতে পারে।
বাঙালির সঙ্গে কাঞ্চনজঙ্ঘার সম্পর্কটা একটু আলাদা। দার্জিলিং, কালিম্পং বা সিকিমে বেড়াতে গেলে কাঞ্চনজঙ্ঘা যেন পরিবারের একজন সদস্য। সকালে জানালা খুলে প্রথম কাজ পাহাড় দেখা। মেঘে ঢাকা থাকলে মনটা একটু খারাপ হয়ে যায়।
অনেক বাঙালির জীবনের প্রথম পাহাড় দেখা মানেই কাঞ্চনজঙ্ঘা। তাই এই পাহাড়ের নাম শুনলেই মনে পড়ে চা, ঠান্ডা হাওয়া আর পাহাড়ি সকালের কথা।
শুধু ভারতীয় নয়, বিদেশি পর্যটকরাও কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রেমে পড়েন। ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান—পৃথিবীর নানা দেশ থেকে মানুষ আসে এই পাহাড় দেখতে। অনেকেই ট্রেকিং করতে আসেন, আবার কেউ শুধু দূর থেকে তার সৌন্দর্য উপভোগ করেন।
বিশেষ করে দার্জিলিংয়ের টাইগার হিল থেকে সূর্যোদয়ের সময় কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অভিজ্ঞতা জীবনে একবার হলেও নেওয়া উচিত। সেই মুহূর্তটা ছবিতে ধরা যায় না, মনে ধরে রাখতে হয়।
স্থানীয় মানুষের কাছে এই পাহাড় কাঞ্চনজঙ্ঘা নামে পরিচিত নয়। তাঁদের ভাষায় এর নাম ‘সেওয়া লুঙ্গমা’। এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বাস আর ধর্মীয় অনুভূতি।
আরও একটি জনপ্রিয় নাম হল ‘ঘুমন্ত বুদ্ধ’ বা ‘স্লিপিং বুদ্ধ’। দূর থেকে তাকালে দেখা যায়, পাঁচটি ছোট-বড় শৃঙ্গ একসঙ্গে এমন একটা আকৃতি তৈরি করেছে, যা অনেকটা শুয়ে থাকা ভগবান বুদ্ধের মতো। মাথা, বুক আর পা—সবকিছু মিলিয়ে এক শান্ত দৃশ্য।
অনেকে বিশ্বাস করেন, এই পাহাড় অঞ্চলের রক্ষাকর্তা। তাই স্থানীয় মানুষ আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাকান।
কাঞ্চনজঙ্ঘা আসলে একা নয়। এর সঙ্গে রয়েছে আরও চারটি বড় শৃঙ্গ। এই পাঁচটি শৃঙ্গ মিলিয়েই কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতগুচ্ছ। প্রতিটি শৃঙ্গের আলাদা নাম, আলাদা উচ্চতা, আর আলাদা গল্প আছে।
এই পাঁচ শৃঙ্গকে ঘিরেই ঘুমন্ত বুদ্ধের ধারণা তৈরি হয়েছে। প্রকৃতি যেন নিজে হাতে একটি ভাস্কর্য তৈরি করেছে।
কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য শুধু আকারে নয়, তার রঙের পরিবর্তনেও। কখনও সাদা, কখনও গোলাপি, কখনও গাঢ় সোনালি। আবহাওয়া বদলালে পাহাড়ের মুডও বদলে যায়।
শীতকালে বরফে ঢাকা থাকে পুরো পাহাড়। গ্রীষ্মে কিছুটা পরিষ্কার দেখা যায়। বর্ষায় মেঘে ঢেকে যায়, তখন শুধু আন্দাজ করা যায় পাহাড়টা কোথায় আছে।
এই পাহাড়ে সোনা নেই, তবু একে সোনার পাহাড় বলা হয়। কারণ এখানে যা আছে, তা সোনার থেকেও দামি। শান্তি, সৌন্দর্য আর বিস্ময়।
একবার কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাকালে মানুষ বুঝতে পারে, পৃথিবী শুধু ব্যস্ত শহর আর কংক্রিটের নয়। এখনও এমন জায়গা আছে, যেখানে প্রকৃতি নিজের মতো করে রাজত্ব করে।
এই কারণেই কাঞ্চনজঙ্ঘা শুধু একটি পাহাড় নয়। এটি ভারতের গর্ব, বাঙালির আবেগ, আর পৃথিবীর এক অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ।


