বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পথে এটি ছিল প্রথম বড় পদক্ষেপ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই নির্বাচন ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে বিতর্ক, অনিয়ম এবং আস্থাহীনতার সূচনার জন্য। প্রশ্ন ওঠে, কেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনকেই এতটা বিতর্কিত বলা হয়? এই লেখায় সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হবে।
স্বাধীনতার পর প্রথম নির্বাচন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ একটি ভাঙাচোরা অর্থনীতি, বিধ্বস্ত অবকাঠামো এবং গভীর রাজনৈতিক আবেগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর নতুন সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর, ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
তৎকালীন সময়ে আওয়ামী লীগ ছিল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন স্বাধীনতার মহানায়ক এবং জনগণের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয়েছিল, এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু জয়ের মাত্রা ও পদ্ধতি নিয়েই শুরু হয় মূল বিতর্ক।
নির্বাচন হলেও প্রশ্নবিদ্ধ কেন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করবে—এ নিয়ে কারও সন্দেহ ছিল না। তবে অভিযোগ উঠেছে, সেই জয়কে আরও নিরঙ্কুশ করতে গিয়ে সারা দেশে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির আশ্রয় নেওয়া হয়।
ভোটকেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার, বিরোধী প্রার্থীদের বাধা দেওয়া, ব্যালট বাক্স স্থানান্তর এবং গণনার স্বচ্ছতার অভাব—এসব অভিযোগ তখন থেকেই শোনা যায়। এর ফলে মানুষের মনে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
কুমিল্লা-৯ আসন ও খন্দকার মোশতাকের আলোচিত জয়
১৯৭৩ সালের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে কুমিল্লা-৯ আসনে। এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। ভোটের দিন শুরুতে খবর আসে যে তিনি পরাজয়ের পথে। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রশিদ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন এলাকায় অত্যন্ত জনপ্রিয়।
অভিযোগ রয়েছে, এই পরিস্থিতিতে কুমিল্লা থেকে ব্যালট বাক্স ঢাকায় নিয়ে আসা হয় এবং সেখানেই পুনর্গণনার মাধ্যমে ফল পাল্টে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত সরকারি ফলাফলে দেখা যায়, খন্দকার মোশতাক বিপুল ভোটে জয়ী হন। এই ঘটনা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে আস্থাহীনতার একটি বড় উদাহরণ হয়ে থাকে।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়: গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত
১৯৭৩ সালের নির্বাচনে মোট ১১টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এর মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই দুটি আসনে বিনা ভোটে জয় পান। প্রশ্ন ওঠে, সত্যিই কি এসব আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না, নাকি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেওয়া হয়নি?
বাকেরগঞ্জ-৪ আসনের ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেখানে জনপ্রিয় নেতা আজহার উদ্দিন আহমদ মনোনয়ন জমা দিতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় স্পষ্ট হয়, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটি তখন সমান ছিল না।
বিরোধী দলহীন প্রথম সংসদ
সবচেয়ে বড় বিস্ময় তৈরি করে নির্বাচনের ফলাফল। ২৯৩টি আসনের সবকটিতেই আওয়ামী লীগ জয় লাভ করে সরকার গঠন করে। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংসদই হয়ে ওঠে বিরোধী দলবিহীন।
সরকার–সমর্থক সংবাদমাধ্যমগুলো আগেই ধারণা দিয়েছিল, বিরোধী দল অন্তত ১৫ থেকে ২০টি আসন পেতে পারে। কিন্তু ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, সংসদে একটি আসনও বিরোধীদের দখলে নেই। এতে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নিয়ে তীব্র প্রশ্ন ওঠে।
সংবাদপত্র ও বুদ্ধিজীবীদের প্রতিক্রিয়া
নির্বাচনের পর অল্পসংখ্যক বিরোধী মনোভাবাপন্ন পত্রিকা এই নির্বাচনকে “প্রহসন” বলে আখ্যা দেয়। দৈনিক গণকণ্ঠ নির্বাচনের পরদিন শিরোনাম করে লেখে—“নির্বাচন প্রহসনে পরিণত”। এই ধরনের শিরোনাম তখনকার রাজনৈতিক উত্তাপকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
বুদ্ধিজীবীরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অনেকেই মনে করেন, বিরোধী দলের উপস্থিতি ছাড়া সংসদীয় গণতন্ত্র পূর্ণতা পায় না। এই অভাব ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে তোলে।
আস্থাহীনতার বীজ কোথায় রোপিত হয়
গবেষকদের মতে, ১৯৭৩ সালের নির্বাচনই বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার সূচনা করে। স্বাধীন দেশের প্রথম নির্বাচন যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে সেই প্রভাব কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই নির্বাচন দেখিয়ে দেয়, শুধু জনপ্রিয়তা থাকলেই গণতন্ত্র শক্ত হয় না। স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা না থাকলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।
ঐতিহাসিক শিক্ষা ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা
১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শিক্ষা। এটি মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়, বরং ন্যায্য ভোট। শক্তিশালী সরকার যেমন দরকার, তেমনি শক্তিশালী বিরোধী দলও জরুরি।
আজও যখন বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন অনেকেই ফিরে তাকান ১৯৭৩ সালের দিকে। কারণ সেখানেই শুরু হয়েছিল সেই বিতর্কের পথচলা, যা আজও পুরোপুরি থামেনি।


