যশোরের ঐতিহাসিক ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত বিশাল জনসভায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. মোহাম্মদ শফিকুর রহমান দেশবাসীর সামনে স্পষ্ট ও দৃঢ় বার্তা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, একদিকে ফ্যামেলি কার্ডের কথা বলা আর অন্যদিকে নারীদের গায়ে হাত তোলা একসঙ্গে চলতে পারে না। এই দুই বিপরীত চিত্রই প্রমাণ করে, ক্ষমতায় গেলে কেউই নিরাপদ থাকবে না। তাঁর এই বক্তব্যে জনসভায় উপস্থিত হাজারো মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও আলোচনা সৃষ্টি হয়।
ডা. শফিকুর রহমান তাঁর বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, মায়েদের ইজ্জতের মূল্য জীবনের চেয়েও বেশি। নারীর প্রতি কোনো ধরনের অপমান, হেনস্তা বা সহিংসতা জামায়াতে ইসলামী কখনোই সহ্য করবে না। তিনি বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কিন্তু কোনো ব্যক্তির গায়ে হাত তোলার অধিকার কারও নেই। কেউ যদি এমন দুঃসাহস দেখায়, তবে সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
তিনি আরও বলেন, ঘরে ও বাইরে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। নারীরা যেন নির্ভয়ে রাস্তায় চলাচল করতে পারেন, কাজ করতে পারেন এবং দেশের উন্নয়নে পুরুষের পাশাপাশি ভূমিকা রাখতে পারেন, সে পরিবেশ তৈরি করাই জামায়াতে ইসলামীর লক্ষ্য।
জনসভায় জামায়াত আমির বিচার ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর হাজার হাজার আসামির নাম দিয়ে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য শুধুই হয়রানি। জামায়াতে ইসলামী প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। আইনের আশ্রয় নেওয়া সবার অধিকার হলেও মিথ্যা মামলায় কাউকে জড়িয়ে নিপীড়ন করা চলবে না।
তিনি জানান, জামায়াতে ইসলামী দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে খুব সীমিত সংখ্যক মামলা করেছে, যেখানে আসামির সংখ্যাও নির্দিষ্ট ও যুক্তিসংগত। এর মাধ্যমে দলটি প্রমাণ করতে চায়, তারা ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনে বিশ্বাসী।
ডা. শফিকুর রহমান যশোরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ও সমস্যাগুলোর কথা তুলে ধরে বলেন, আল্লাহ তাআলা যদি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেন, তবে যশোরকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হবে। পাশাপাশি ৫০০ শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ এবং বহুল আলোচিত ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হবে।
তিনি বলেন, যশোরবাসীর এসব দাবি কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং তাদের ন্যায্য অধিকার। জামায়াতের প্রতীক দাঁড়িপাল্লা ন্যায় ও ভারসাম্যের প্রতীক। পাল্লার মাপে কোনো কমবেশি হবে না, যার যা প্রাপ্য তা বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
গণভোট প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, ‘হ্যাঁ’ মানেই আজাদী আর ‘না’ মানেই আবার সেই পুরনো গোলামি। হ্যাঁ ভোট বিজয়ী হলে বাংলাদেশ বিজয়ী হবে। আর না ভোটের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, জনগণের প্রকৃত মতামত ছাড়া ক্ষমতায় গিয়ে সরকার গঠন করলেও তাতে দেশের কোনো লাভ হবে না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জামায়াতে ইসলামী একটি দুর্নীতিমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত, আধিপত্যবাদমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়। জনগণের ভালোবাসা ও ভোটে নির্বাচিত হলে সবাইকে সঙ্গে নিয়েই দেশ পরিচালনা করা হবে। বিভক্তির রাজনীতি নয়, ঐক্যের রাজনীতিই হবে আগামী দিনের পথ।
তিনি চাঁদাবাজির ভয়াবহ প্রভাব তুলে ধরে বলেন, চাঁদার কারণে কৃষক তার পণ্যের ন্যায্য মূল্য পায় না, ভোক্তাও ন্যায্য দামে পণ্য কিনতে পারে না। মাঝখানে চাঁদাবাজরা ভাগ বসিয়ে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেয়। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে এই চাঁদাবাজির শিকড় উপড়ে ফেলা হবে।
কিছু দলের দেওয়া প্রতিশ্রুতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ১০ টাকা কেজি দরে চাল বা বেকারভাতা দেওয়ার কথা বলে জনগণকে আর ধোঁকা দেওয়া যাবে না। শুধু ভাতা দিলে বেকারত্ব কমে না, বরং বাড়ে। জামায়াতে ইসলামী নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বেকারদের স্বাবলম্বী করে তুলতে চায়, যাতে তারা সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারে।
জামায়াত আমির বলেন, জামায়াতে ইসলামী একটি নির্যাতিত ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দল। তবুও তাদের কেউ কখনো মুদি দোকানি, হকার বা অসহায় মানুষের কাছ থেকে চাঁদা নেয়নি। যারা ভুল পথে আছে, তাদেরও ভালো পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। প্রতিহিংসা নয়, সংশোধনই হবে রাজনীতির মূল লক্ষ্য।
সকাল থেকেই যশোরে জামায়াতে ইসলামীর জনসভাকে ঘিরে বিপুল জনসমাগম দেখা যায়। ভোররাত থেকে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও আশপাশের এলাকা থেকে নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা ঈদগাহ ময়দানে জড়ো হতে থাকেন। সকাল সাড়ে আটটার পর পুরো এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে।
জনসভায় উপস্থিতদের হাতে ছিল দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লা সম্বলিত ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড। পুরো পরিবেশ ছিল উৎসবমুখর ও প্রাণবন্ত।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন যশোর জেলা জামায়াতের আমির গোলাম রসুল। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরোয়ার এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম। এছাড়া কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের বহু নেতা, সংসদ সদস্য প্রার্থী এবং বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বক্তব্য শেষে ডা. শফিকুর রহমান যশোরের বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাদের হাতে দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লা তুলে দেন।
যশোরের এই জনসভা শুধু একটি রাজনৈতিক সমাবেশ নয়, বরং এটি ছিল নারী নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, উন্নয়ন ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের একটি স্পষ্ট ঘোষণাপত্র। ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে উঠে এসেছে জনগণের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, প্রত্যাশা ও স্বপ্নের কথা। এখন দেখার বিষয়, এই বার্তা আগামী দিনের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।


