বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ চলছে এবং এরই মধ্যে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর শীর্ষ ও সিনিয়র নেতারা নিজ ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নিজেদের জয়ের ব্যাপারে আশা প্রকাশ করেছেন।
সারাদেশে কোথাও কোথাও ভোটার উপস্থিতি কম দেখা গেলেও সার্বিকভাবে তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। যদিও নির্বাচনের আগের রাতে অংশগ্রহণকারী দলগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ এনেছিল।
তবে সকাল সাড়ে নয়টা পর্যন্ত গোপালগঞ্জের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি নেই বললেই চলে বলে জানিয়েছেন বিবিসি সংবাদদাতা। তিনি জানান, অনেক কেন্দ্রে ধানের শীষ ছাড়া অন্য প্রার্থীর এজেন্ট তার চোখে পড়েনি।
নির্ধারিত সময় সকাল সাড়ে সাতটায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে এবং বিরতিহীনভাবে এটি চলবে বেলা সাড়ে চারটা পর্যন্ত।
অন্তর্বর্তী সরকার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে রাখায় আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। অন্যদলগুলোর অংশগ্রহণে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে আজ ভোটগ্রহণ হচ্ছে। একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুরের একটি আসনে আজ ভোট হচ্ছে না।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, দেশে এবার মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। সারাদেশে মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৪২ হাজার ৭৭৯টি।
ইস্কাটনে ভোট দিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, “মানুষ উৎসবের আনন্দে মেতে উঠেছে। ঈদের আনন্দ নিয়ে তারা ভোট দিচ্ছে। দুই একটা জায়গায় কেন্দ্রের বাইরে সামান্য গোলমাল হলেও তা তাৎক্ষণিকভাবে মেটানো হচ্ছে”।
ঢাকাসহ সারাদেশের ভোটকেন্দ্রগুলোতেই ভোট দেওয়ার জন্য সকাল থেকেই ভোটারদের কম বেশি উপস্থিতি দেখা গেছে। আবার ঢাকাসহ অনেক জায়গায় ভোট ধীরগতিতে হচ্ছে বলে অনেক ভোটার জানিয়েছেন।
ভোটের শুরু কেমন হলো
তবে ঢাকার কাছে গোপালগঞ্জের কিছু কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি দেখা যায়নি। ভোটার উপস্থিতি কম দেখা গেছে সিলেটেও। সেখানে অনেক কেন্দ্রে সকালের দিকে পোলিং এজেন্টদের অনুপস্থিতিতে ভোট গ্রহণ শুরু হয়।
তবে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি বাড়বে।
বরিশালেও কিছু কেন্দ্রে দেরিতে ভোট গ্রহণ শুরুর খবর পাওয়া গেছে। বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে এজেন্টের অভাবে ভোটগ্রহণ ৩০ মিনিট দেরীতে শুরু হয়েছে বলে প্রিজাইডিং অফিসার নিশ্চিত করেছেন।
চট্টগ্রামের সাংবাদিক মিন্টু চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, সেখানেও তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাননি তারা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা তার এলাকায় বিভিন্ন জায়গায় সিল মারার পায়তারা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন।
“আমি সেনাবাহিনী, পুলিশ ও ডিসি সবার কাছে আমি এই কেন্দ্রগুলোর নামগুলো পাঠিয়ে দিয়েছি। দেখা যাক কি হয়,” বলেছেন তিনি।
ঢাকায় এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অবশ্য অভিযোগ করেছেন যে, বিভিন্ন জায়গায় তাদের বিভিন্ন প্রার্থী ও কর্মীদের ওপর হামলা ও নির্বাচনী ক্যাম্প বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
“কিন্তু আমরা এই প্রতিকূলতাকে ফোকাস করছি না। আমরা চাই জনগণ ভোটে আসুক। ব্যালটের মাধ্যমে এসবের জবাব দিক,” বলেছেন তিনি।
শীর্ষ নেতারা যা বললেন
ভোটের আগের রাতে কয়েকটি জেলায় টাকা উদ্ধার, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি কোনো কোনো জায়গায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি থাকলেও আজ দিনের শুরুতে ভোটের পরিস্থিতি নিয়ে কার্যত সন্তুষ্টিই প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণকারী দলগুলোর নেতারা।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সকাল সাড়ে নয়টা দিকে গুলশান মডেল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন। এরপর সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি তার দলের জয়লাভের বিষয়ে আশা প্রকাশ করেছেন।
ভোট কেমন হচ্ছে জানতে চাইলে মি. রহমান বলেন, “সারাদেশের খবর এখনো পাইনি। তবে গত রাতে বিভিন্ন জায়গা থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত খবর পেয়েছি, যা কাম্য নয়। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর রাতে সেসব অনাকাঙ্ক্ষিত বিষময় দমন করেছে। দেশের মানুষ ভোট দিলে যে কোনো ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়া সম্ভব”।
প্রায় একই সময়ে তারেক রহমান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় দেয়া পোস্টে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলেছেন, আজ আপনারা সবাই ভোটকেন্দ্রে আসুন, ভোট দিন এবং নির্বাচিত প্রার্থীদের দায়িত্ব অর্পণ করুন। কাল থেকে আপনাদের সংসদ সদস্যরাই আপনাদের দায়িত্ব নেবেন এবং আপনাদের সেবায় নিয়োজিত থাকবেন, ইনশাআল্লাহ। ধানের শীষের বিজয়ী প্রতিটি প্রার্থী যেন সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেন, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমি নেব।”
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সকাল সাড়ে আটটায় ঢাকার মিরপুরের মনিপুরে তার কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন। এরপর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনিও সরকার গঠনের বিষয়ে আশা প্রকাশ করেছেন।
নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা দেখছেন কি-না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আমি তো কেবল আসলাম, এই কেন্দ্রে এসে ভোটটা দিলাম। এখন বাকি কেন্দ্রগুলো দেখব, সারা দেশের খবর নেব। আমরা ছোটখাটো কোনো বিষয় হলে অবশ্যই এগুলোকে ইগনোর করবো। কিন্তু বড় কোনো বিষয় হলে আমরা ছাড় দিব না এবং আমাদের যা করা প্রয়োজন, তাই করব। কারণ মানুষের ভোটের অধিকার হারিয়ে যাক, এটা আমরা কোনোভাবেই চাই না।”
ফল যাই হোক, মেনে নেবেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা চাই সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে রেজাল্ট যেটা হবে সেইটা। ভোট যখন সুষ্ঠু হবে, নিরপেক্ষ হবে-সেই রেজাল্ট আমরাও মানবো অন্যদেরকেও মানতে হবে”।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁওয়ে ভোট দিয়েছেন। ভোটের পর তিনি বলেছেন, “অনেক রক্তপাত ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে নির্বাচন দিয়ে শুভ সূচনা হয়েছে। এ নির্বাচন আশা করছি সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হবে। সবার অংশগ্রহণে এ নির্বাচন বাংলাদেশর জন্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।
জামায়াত জোটে থেকে নির্বাচন করা এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ভোট দিয়েছেন বাড্ডার একেএম রহমতউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন সকাল আটটায়।
এরপর সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “ব্যালটে জনরায় প্রতিফলিত হবে। আমরা সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছি। ব্যাপক ভোটার উপস্থিতিই আমাদের লক্ষ্য। কেন্দ্র পাহাড়া দিবো। জনরায়কে মেনে নিবো”।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ভোট দিয়েছেন খুলনায়।
সকালে ভোট সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। এ মুহূর্তে পর্যন্ত যা দেখছি তা ইতিবাচক। উৎসবমুখর মানসিকতার সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। ভোটারদের লম্বা লাইন দেখলাম। আমি আমার এখানে এখনো কোনো শঙ্কা দেখছি না।”
সূত্র: বিবিসি বাংলা।


