বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে আবারও সরব হলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। যেসব রাজনৈতিক শক্তি দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিশ্বাস করে না, তাদের হাতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তুলে দেওয়া মানেই দেশের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া—এমন স্পষ্ট প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তার ভাষায়, স্বাধীনতায় বিশ্বাসহীন দলকে ভোট দেওয়া হলে তা সরাসরি দেশের সর্বনাশ ডেকে আনবে।
ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাচনী সভায় কড়া বার্তা
সোমবার, ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ২৯ মাইল এলাকার বিডি স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত এক নির্বাচনী জনসভায় এই বক্তব্য দেন বিএনপির মহাসচিব। মাঠভর্তি মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, দেশের মানুষ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছে। এই সময় ভুল সিদ্ধান্ত নিলে তার খেসারত দিতে হবে আগামী প্রজন্মকে।
তিনি বলেন, যে রাজনৈতিক গোষ্ঠী একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতা করেছে, যারা হাজার হাজার নিরীহ মানুষ হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল, তারাই আজ আবার ভোট চাইছে। শুধু তাই নয়, তারা দেশ পরিচালনার দাবিও করছে। মির্জা ফখরুলের প্রশ্ন, যারা অতীতে দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, তারা কীভাবে আজ দেশের দায়িত্ব পাওয়ার যোগ্য হতে পারে।
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনা রক্ষার আহ্বান
মির্জা ফখরুল তারু বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ একটি রক্তের বিনিময়ে অর্জিত দেশ। এই দেশের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি শহীদের রক্তে ভেজা। সেই ইতিহাস অস্বীকার করে যারা রাজনীতি করতে চায়, তারা কখনোই দেশের মঙ্গল করতে পারে না। তিনি জনগণকে স্মরণ করিয়ে দেন, ভোট দেওয়া শুধু একটি অধিকার নয়, এটি একটি দায়িত্বও।
তার মতে, ভোটের মাধ্যমে জনগণ ঠিক করে দেয় কোন পথে দেশ চলবে। তাই স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে প্রত্যাখ্যান করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
হিন্দু সম্প্রদায়ের উদ্দেশে সাহসী বার্তা
বিএনপির মহাসচিব বিশেষভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের উদ্দেশে কথা বলেন। তিনি বলেন, হিন্দু ভাই-বোনেরা অনেক সময় চুপ করে থাকেন, কথা বলতে ভয় পান। কিন্তু ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আপনারা এই দেশের সংখ্যালঘু নন। আপনারা বাংলাদেশের সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক।
তিনি প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, এই দেশে কোনো সংখ্যালঘু নেই, সবাই বাংলাদেশি। সবার অধিকার সমান। তাই মাথা নিচু করে নয়, বুক সোজা করে দাঁড়াতে হবে। বিএনপি সব সময় আপনাদের পাশে ছিল, আছে এবং থাকবে।
মির্জা ফখরুল আশ্বাস দেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে সবার অধিকার রক্ষা করা হবে। মা-বোন-ভাই, হিন্দু-মুসলিম সবাই সমান নিরাপত্তা ও মর্যাদা পাবে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে মন্তব্য
আগের নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একসময় নির্বাচনে নৌকা ও ধানের শীষের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো। জনগণের সামনে পরিষ্কার দুটি বিকল্প থাকত। কিন্তু এখন সেই বাস্তবতা আর নেই।
তিনি অভিযোগ করেন, নৌকার কান্ডারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে অবস্থান করছেন। দিল্লিতে বসে আছেন তিনি। দেশের জনগণকে বিপদের মুখে ফেলে দিয়ে চলে গেছেন। তার মতে, তিনি দেশে থাকলে অন্তত একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চলত।
মির্জা ফখরুল আরও বলেন, এখন নতুন নতুন প্রতীক ও শক্তি সামনে আসছে, যাদের উদ্দেশ্য ও ইতিহাস নিয়ে জনগণের সতর্ক থাকা জরুরি।
রাজনীতি কোনো ব্যবসা নয়: ফখরুল
নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কথা উল্লেখ করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, এটি তার জীবনের শেষ নির্বাচন। শেষ সময়ে তিনি মানুষের কাছে একটি সুযোগ চাইতে এসেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বিএনপি রাজনীতিকে কখনো ব্যবসা হিসেবে দেখেনি। বিএনপি রাজনীতি করে মানুষের কল্যাণের জন্য।
তিনি বলেন, আমরা ফাঁকা কথা বলি না। আমরা কথার ফুলঝুরি ছড়াই না। কাজে বিশ্বাস করি। দেশ চালাতে হলে শুধু স্লোগান নয়, প্রয়োজন সৎ নেতৃত্ব ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা।
তরুণ নেতৃত্ব ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি
মির্জা ফখরুল বলেন, এবার জনগণের ছেলে প্রতিনিধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি দেলাওয়ারের কথা উল্লেখ করে বলেন, দেলাওয়ার একজন ভালো ছেলে, অল্প বয়সী, উদ্যমী। তিনি নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমরা কোনো দলের বদনাম করতে চাই না। কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। আমরা কাজ করতে চাই। এলাকার উন্নয়ন, মানুষের জীবনমান উন্নত করাই আমাদের লক্ষ্য।
ভোটারদের প্রতি শেষ আহ্বান
বক্তব্যের শেষ অংশে বিএনপির মহাসচিব ভোটারদের প্রতি সরাসরি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এই নির্বাচন শুধু একজন প্রার্থী বেছে নেওয়ার বিষয় নয়। এটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের নির্বাচন।
তিনি জনগণকে অনুরোধ করেন, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পক্ষে ভোট দিতে। ভয় নয়, সাহস নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে। কারণ আজকের সিদ্ধান্তই ঠিক করবে আগামী দিনের বাংলাদেশ কেমন হবে।
মির্জা ফখরুলের কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা আর চোখে ছিল প্রত্যাশা। তার বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি চান এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে সবাই নিরাপদ থাকবে, কথা বলতে পারবে, এবং গর্বের সঙ্গে নিজেকে বাংলাদেশি বলতে পারবে।


