আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নড়াইল-২ আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ দিন দিন বাড়ছে। এই উত্তাপের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আলহাজ্ব মনিরুল ইসলাম। কলস মার্কা নিয়ে তার নির্বাচনী প্রচারণা এখন নড়াইল শহরজুড়ে আলোচনার প্রধান বিষয়। বৃহস্পতিবার বিকেলে নড়াইলের রাজপথে যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা শুধু একটি প্রচারণা নয়, বরং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, আবেগ আর পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
বিকেল গড়াতেই নড়াইল শহরের শিল্পকলা একাডেমী চত্বর জনসমুদ্রে রূপ নেয়। হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন এক লক্ষ্য নিয়ে, কলস মার্কার পক্ষে সমর্থন জানাতে। ব্যানার, ফেস্টুন আর স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এখান থেকেই শুরু হয় বিশাল মিছিল, যা শহরের প্রধান সড়কগুলো ঘুরে মুচিপোল এলাকায় গিয়ে শেষ হয়। পুরো পথজুড়ে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো ছিল।
এই মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তরুণ, বয়স্ক, শ্রমজীবী, ব্যবসায়ী, এমনকি প্রথমবার ভোট দিতে আসা তরুণ ভোটারদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। স্লোগানে স্লোগানে রাজপথ যেন প্রাণ ফিরে পায়। অনেকেই বলছিলেন, দীর্ঘদিন পর এমন প্রাণবন্ত রাজনৈতিক পরিবেশ তারা দেখছেন।
অনেক সাধারণ ভোটারের মুখেই শোনা গেছে একই কথা। তারা এমন একজন প্রার্থী চান, যিনি তাদের কষ্ট বোঝেন, পাশে দাঁড়ান এবং ভয়ভীতি ছাড়া কথা বলতে পারেন। কলস মার্কাকে তারা সেই প্রতীক হিসেবেই দেখছেন। তাই মিছিলের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল উৎসবমুখর, আবার একই সঙ্গে প্রত্যাশায় ভরা।
মিছিল চলাকালে শুধু স্লোগানই নয়, মানুষের কথাবার্তাতেও স্পষ্ট ছিল পরিবর্তনের ইঙ্গিত। কেউ বলছিলেন উন্নয়ন চান, কেউ চাইছেন ন্যায়বিচার, আবার কেউ শুধু চান শান্তিতে ভোট দেওয়ার অধিকার। এই চাওয়া-পাওয়ার মাঝখানেই মনিরুল ইসলাম নিজেকে তুলে ধরেছেন একজন নির্যাতিত রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে, যিনি দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে এসেছেন।
মিছিল শেষে মুচিপোল এলাকায় অনুষ্ঠিত হয় পথসভা। এখানে উপস্থিত জনতার ভিড় প্রমাণ করে দেয়, নড়াইল-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রতি আগ্রহ কতটা গভীর। মানুষ মনোযোগ দিয়ে তার বক্তব্য শোনেন, হাততালি দিয়ে সমর্থন জানান।
পথসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে আলহাজ্ব মনিরুল ইসলাম নিজের রাজনৈতিক জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে তিনি আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। এই সময়ে তার বিরুদ্ধে হয়েছে ৮৮টি মামলা। শুধু তিনি নন, নড়াইল ও লোহাগাড়া এলাকায় তার প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার নেতাকর্মীর নামেও মামলা রয়েছে।
তিনি বলেন, এই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তিনি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদও হারিয়েছেন। কিন্তু পদ হারালেও আদর্শ থেকে সরে যাননি। নির্যাতিত নেতাকর্মী এবং তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন।
তার কথায় ছিল ব্যক্তিগত কষ্ট, আবার ছিল লড়াই চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ়তা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, রাজনীতি তার কাছে ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের পাশে থাকার মাধ্যম।
মনিরুল ইসলাম তার বক্তব্যে বারবার নির্যাতনের শিকার নেতাকর্মীদের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মামলা, হয়রানি আর চাপের মুখেও তারা মাঠ ছাড়েননি। এই মানুষগুলোর পরিবারের কষ্ট তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। তাই তাদের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকেই তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
এই বক্তব্যে অনেক সমর্থকের চোখে আবেগ দেখা গেছে। কেউ কেউ মাথা নেড়ে সমর্থন জানিয়েছেন, কেউ হাততালি দিয়ে তার কথার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। এতে বোঝা গেছে, এই আসনে রাজনৈতিক আবেগ কতটা গভীরভাবে কাজ করছে।
বক্তব্যের শেষ অংশে মনিরুল ইসলাম ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলেন। তিনি জানান, নির্বাচিত হলে তিনি জনগণের কল্যাণে কাজ করতে চান। তার লক্ষ্য একটি শান্তিপূর্ণ, উন্নত ও বাসযোগ্য নড়াইল গড়ে তোলা।
তিনি বলেন, উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা বা ভবন নয়। উন্নয়ন মানে মানুষের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং সম্মান নিয়ে বাঁচার সুযোগ। তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক শান্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
এই কথাগুলো শুনে অনেক ভোটার আশাবাদী হয়ে ওঠেন। তাদের মতে, একজন প্রার্থী যখন নিজের অভিজ্ঞতা আর কষ্টের কথা খোলাখুলি বলেন, তখন তার ওপর বিশ্বাস করা সহজ হয়।
এই প্রচারণা শুধু দলীয় কর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সাধারণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বড় বার্তা। অনেকেই শুধু কৌতূহল থেকে এসেছিলেন, আবার অনেকে এসেছিলেন সিদ্ধান্ত নিয়ে।
একজন মধ্যবয়সী ভোটার বলছিলেন, তিনি এমন একজন প্রতিনিধি চান, যিনি এলাকায় থাকবেন, ফোন ধরবেন এবং সমস্যার কথা শুনবেন। আরেক তরুণ ভোটার জানান, তিনি নতুন কিছু দেখতে চান, পুরনো রাজনীতির বাইরে গিয়ে।
এই কথাগুলো থেকেই বোঝা যায়, নড়াইল-২ আসনে ভোটারদের মনোভাব বদলাচ্ছে। তারা এখন প্রতীক নয়, মানুষ দেখে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনিরুল ইসলামের শক্ত অবস্থান নির্বাচনী সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তার প্রচারণায় মানুষের ভিড় প্রমাণ করে দেয়, এই আসনে লড়াই সহজ হবে না কারও জন্যই।
কলস মার্কা এখন শুধু একটি প্রতীক নয়, এটি অনেকের কাছে প্রতিবাদের ভাষা, আবার কারও কাছে আশার প্রতীক। এই প্রতীককে ঘিরে যে জনসমর্থন তৈরি হয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলাফলে কী প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।


