আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সম্ভাব্য গণভোটকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন একটি সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাংবাদিক এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের কার্ড সংগ্রহের পুরো প্রক্রিয়া এবার শতভাগ অনলাইনে নেওয়া হয়েছে। এতদিন যে প্রক্রিয়াটি ছিল ঝামেলাপূর্ণ, সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল, সেটিকে সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে এই ডিজিটাল উদ্যোগ নিয়েছে কমিশন।
এই সিদ্ধান্তের ফলে আর সাংবাদিক বা পর্যবেক্ষকদের নির্বাচন কমিশন কিংবা রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তরে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হবে না। ঘরে বসেই অনলাইনে আবেদন করে কার্ড ও গাড়ির স্টিকার সংগ্রহ করা যাবে। বিষয়টি দেশের গণমাধ্যমকর্মী ও পর্যবেক্ষক মহলে ইতোমধ্যে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের নতুন সিদ্ধান্ত কেন গুরুত্বপূর্ণ
নির্বাচনের সময় সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে তাদের উপস্থিতি এবং কাজ করার সুযোগ থাকা দরকার। আগে এই কার্ড সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেককে ভোগান্তিতে পড়তে হতো। কেউ দূর জেলা থেকে ঢাকায় আসতেন, কেউ আবার শেষ মুহূর্তে কার্ড না পেয়ে সমস্যায় পড়তেন।
নির্বাচন কমিশন এই বাস্তবতা বুঝে পুরো ব্যবস্থাকে আধুনিক করার উদ্যোগ নিয়েছে। জনসংযোগ পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানিয়েছেন, পুরোনো পদ্ধতিতে আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই ও কার্ড বিতরণ করতে প্রচুর সময় এবং অর্থ ব্যয় হতো। নতুন অনলাইন ব্যবস্থায় সেই সমস্যার সমাধান হবে।
সাংবাদিক কার্ডের জন্য অনলাইন আবেদন: কীভাবে করবেন
সাংবাদিকদের জন্য নতুন এই অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া বেশ সহজ রাখা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ শাখার নির্ধারিত ওয়েবসাইট pr.ecs.gov.bd-এ প্রবেশ করে আবেদন করতে হবে। সেখানে একটি অনলাইন ফরম পূরণ করতে হবে, যেখানে ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্য দিতে হবে।
আবেদনের সময় যেসব কাগজপত্র সংযুক্ত করতে হবে সেগুলো হলো অফিসের প্যাডে করা আবেদনপত্রের স্ক্যান কপি, কর্মরত গণমাধ্যমের পরিচয়পত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং সাম্প্রতিক ছবি। যারা ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন, তাদের জন্য পিআইডি কার্ড সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সব তথ্য ঠিকভাবে জমা দেওয়ার পর আবেদনটি অনলাইনে যাচাই করা হবে। অনুমোদন মিললে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক নিজ নিজ স্থান থেকেই সাংবাদিক কার্ড ডাউনলোড করতে পারবেন।
নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের জন্য কার্ড ও গাড়ির স্টিকার
শুধু সাংবাদিক নয়, দেশীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রতিনিধিরা অনলাইনে আবেদন করে তাদের পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে পারবেন। পাশাপাশি যারা মাঠপর্যায়ে কাজ করবেন, তারা গাড়ির স্টিকারও অনলাইনে ডাউনলোড করার সুযোগ পাবেন।
আগে পর্যবেক্ষকদের ক্ষেত্রেও সরাসরি আবেদন করতে হতো, যা অনেক সময় জটিল হয়ে উঠত। নতুন ব্যবস্থায় এই প্রক্রিয়াটি অনেক সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিজিটাল ব্যবস্থার সুফল কী
এই অনলাইন পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সময় সাশ্রয়। কয়েক দিনের কাজ এখন কয়েক মিনিটেই করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক ব্যয় কমবে। কাগজপত্র, প্রিন্টিং, ডাকযোগে পাঠানো—সবকিছুই প্রায় অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে।
আরেকটি বড় দিক হলো স্বচ্ছতা। অনলাইনে আবেদন ও অনুমোদনের ফলে কার্ড প্রদানের পুরো প্রক্রিয়া ট্র্যাক করা যাবে। এতে অনিয়মের সুযোগ কমবে এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে।
সাংবাদিকদের জন্য কী বার্তা দিল নির্বাচন কমিশন
নির্বাচন কমিশন সাংবাদিকদের অনুরোধ করেছে, তারা যেন সময়মতো অনলাইনে আবেদন করেন এবং সঠিক তথ্য প্রদান করেন। ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য দিলে আবেদন বাতিল হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে কমিশন জানিয়েছে, এই অনলাইন ব্যবস্থায় কোনো ধরনের সমস্যা হলে ওয়েবসাইটে দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে অথবা জনসংযোগ শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে।
গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষক মহলের প্রতিক্রিয়া
নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে সাংবাদিক সংগঠন ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো। তাদের মতে, ডিজিটাল পদ্ধতিতে আবেদন চালু হওয়ায় মাঠপর্যায়ে কাজ করা অনেক সহজ হবে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।
অনেকে বলছেন, এটি শুধু কার্ড সংগ্রহের প্রক্রিয়া নয়, বরং নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় একটি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।
ভবিষ্যতের নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল ধারা
এই উদ্যোগের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা ধীরে ধীরে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে চায়। অনলাইন আবেদন, ডিজিটাল যাচাই-বাছাই এবং স্বয়ংক্রিয় কার্ড বিতরণ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে নির্বাচন প্রক্রিয়া আরও কার্যকর, সাশ্রয়ী ও জনবান্ধব হবে।
শেষ কথা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংবাদিক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের কার্ড প্রদানের এই নতুন অনলাইন ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এতে যেমন ভোগান্তি কমবে, তেমনি নির্বাচন কমিশনের কাজেও গতি আসবে। সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করতে এই ধরনের আধুনিক উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।


