আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে সারাদেশে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে মোট ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৭ হাজার ৫৫৬টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই বাস্তবতায় ভোটের পরিবেশ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভোটারদের আস্থার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।
ঢাকা মহানগরীর মোট ২ হাজার ১৩১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৬৯৫টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১ হাজার ১৩৩টি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। বাকি কেন্দ্রগুলোকে সাধারণ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ রাজধানীর বেশিরভাগ কেন্দ্রই কোনো না কোনোভাবে ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এই ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েই কেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা করা হয়েছে। কোথায় কতজন পুলিশ সদস্য থাকবেন, কী ধরনের নজরদারি থাকবে, সবকিছু আগেই নির্ধারণ করা হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিতে। পুলিশ জানিয়েছে, ভোটকেন্দ্রে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অনিয়ম দেখা দিলে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো ঘটনা ভিডিও করবেন। সেই ভিডিও দেখে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ অনেক কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। এতে করে ভোটের দিন কী ঘটছে, তার একটি দৃশ্যমান প্রমাণ থাকবে বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পুলিশ সদর দপ্তরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কেন্দ্রের ঝুঁকি অনুযায়ী পুলিশ মোতায়েন করা হচ্ছে। অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে থাকবেন তিনজন পুলিশ সদস্য। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে থাকবেন দুইজন। আর সাধারণ কেন্দ্রে থাকবেন একজন পুলিশ সদস্য। এর পাশাপাশি মোবাইল টিম ও রিজার্ভ ফোর্সও প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।
পুলিশের দাবি, এই ব্যবস্থা ভোটকেন্দ্র দখল, মারামারি বা জোরজবরদস্তির মতো পরিস্থিতি ঠেকাতে সহায়ক হবে।
বাস্তবতা হলো, বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। অনেক ভোটার অভিযোগ করেছিলেন, তারা ঠিকমতো ভোট দিতে পারেননি। কোথাও ভোটকেন্দ্রে যেতে ভয় পেয়েছেন, কোথাও ভোট দেওয়ার আগেই ফল নির্ধারিত ছিল বলে মনে করেছেন।
এই অভিজ্ঞতার কারণেই এবারও অনেক মানুষের মনে শঙ্কা রয়ে গেছে। কেউ কেউ বলছেন, পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন ভোট দিতে যাবেন কি না। আবার কেউ কেউ তুলনামূলক আশাবাদী। একজন ভোটার বলছেন, পরিবেশ ভালো থাকলে তিনি অবশ্যই ভোট দিতে যাবেন। আরেকজনের কথা, এবার পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো মনে হচ্ছে, তাই নির্ভয়ে ভোট দেবেন।
অন্তর্বর্তী সরকার দাবি করছে, এবার পুলিশ যাতে কোনো দল বা প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করে, সে জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরইমধ্যে লটারির মাধ্যমে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই পদ্ধতিতে দেশের সব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পরিবর্তন করা হয়েছে।
এছাড়াও নির্বাচনের সময় কী করা যাবে আর কী করা যাবে না, সে বিষয়ে দেড় লাখ পুলিশ সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই—ভোটের দিন যেন পুলিশ নিরপেক্ষ থাকে এবং আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিকল্পনা ভালো হলেও ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নির্বাচনের সময় লুট হওয়া অস্ত্র, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার কিংবা হঠাৎ গুজব বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, অতীতের চ্যালেঞ্জগুলো এখনো সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা আছে। বিশেষ করে ভোটকেন্দ্র দখলের মানসিকতা আবারও ফিরে আসতে পারে। তিনি বলেন, মব প্রক্রিয়া, নির্বাচনী পরিবেশ এবং নির্দিষ্ট আসনকে ঘিরে সহিংসতা যেকোনো সময় পরিস্থিতি ঘোলাটে করে তুলতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সারাদেশে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে চলমান রয়েছে অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২। এই অভিযানের লক্ষ্য হচ্ছে অপরাধী চক্রকে দুর্বল করা এবং ভোটের সময় কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঠেকানো।
ডিএমপি জানিয়েছে, রাজধানীতে ভোটের নিরাপত্তা নিয়ে আলাদা ও বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভোটের আগে, ভোটের দিন এবং ভোটের পর—এই তিন ধাপে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আলাদা প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) তালেবুর রহমান জানিয়েছেন, ভোটকেন্দ্রের অবস্থান ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েই নিরাপত্তা পরিকল্পনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, কেন্দ্রগুলোকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে সেই অনুযায়ী পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। এর বাইরে যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত বাহিনীও প্রস্তুত থাকবে।
তার কথায়, ভোটকে ঘিরে যাতে কোনো ধরনের সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা না ঘটে, সেটাই পুলিশের প্রধান লক্ষ্য।
পুলিশের পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। এতে করে একক কোনো বাহিনীর ওপর পুরো দায়িত্ব না থেকে সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সব প্রস্তুতির পরও বড় চ্যালেঞ্জ থেকে যাচ্ছে মানুষের আস্থা। ভোটার যদি কেন্দ্রে গিয়ে নিরাপদ বোধ না করেন, তাহলে শত পরিকল্পনাও কাজে আসবে না। তাই বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ আচরণই এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এই নির্বাচন কতটা শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ আর নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগের ওপর।


