যশোর-২ (চৌগাছা-ঝিকরগাছা) আসনকে ঘিরে নির্বাচনী মাঠে উত্তেজনা দিন দিন বাড়ছেই। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর করা অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেছেন বিএনপি প্রার্থী সাবিরা সুলতানা মুন্নি। সোমবার দুপুরে যশোর প্রেসক্লাবে জেলা ও উপজেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। এই সংবাদ সম্মেলন ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে।
সংবাদ সম্মেলনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সাবিরা সুলতানা মুন্নি বলেন, গত ২৫ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ যে অভিযোগ তুলেছেন, তা পুরোপুরি ভিত্তিহীন। তিনি দাবি করেন, নারী কর্মীদের ওপর হামলা ও শ্লীলতাহানির যে কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। বরং এটি নির্বাচনের মাঠে সহানুভূতি আদায় এবং ভোটারদের বিভ্রান্ত করার একটি কৌশল মাত্র।
মুন্নির বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল আত্মবিশ্বাস। তিনি বলেন, নির্বাচনী পরিবেশ ঘোলাটে করতে পরিকল্পিতভাবে এই ধরনের মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য মোটেই শুভ নয়।
বিএনপি প্রার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, ঝিকরগাছার কীর্তিপুর গ্রামে কোনো হামলা বা শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেনি। তিনি জানান, ওই দিন জামায়াতের কয়েকজন নারী কর্মী তার বাড়িতে যান। সেখানে তারা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট না দিলে ‘মোনাফেক’ এবং ‘জান্নাত বঞ্চিত’ হওয়ার মতো উসকানিমূলক মন্তব্য করেন।
এই বক্তব্য শুনে তার দেবর, যিনি উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আরাফাত হোসেন কল্লোল, বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা চান। কিছু কথাবার্তার পর পরিস্থিতি শান্ত হয়ে যায় এবং কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই বিষয়টির সমাপ্তি ঘটে। মুন্নির দাবি, এটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে সাবিরা সুলতানা মুন্নি বিশেষভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নারীদের শ্লীলতাহানি সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে। তিনি বলেন, একজন নারী প্রার্থী হিসেবে তিনি সবসময় নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তা রক্ষার কথা বলে আসছেন। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তোলা শুধু অপমানজনক নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে তাকে হেয় করার একটি জঘন্য চেষ্টা।
তার ভাষায়, “নারীর সম্মান নিয়ে রাজনীতি করা আমাদের আদর্শের অংশ। সেখানে নারীকে ব্যবহার করে মিথ্যা নাটক সাজানো অত্যন্ত নিন্দনীয়।” তিনি একে নির্বাচনী মাঠে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার ষড়যন্ত্র হিসেবেও উল্লেখ করেন।
বিএনপি প্রার্থী আরও দাবি করেন, তার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় একটি কুচক্রিমহল আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। সেই কারণেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, এসব অপপ্রচার সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে, যা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।
মুন্নি এসব অপপ্রচারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে সাংবাদিকদের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানান। তার মতে, সত্যের শক্তি দিয়েই সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করা সম্ভব।
যশোর-২ আসন দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চৌগাছা ও ঝিকরগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে প্রতিবারই জমে ওঠে ত্রিমুখী লড়াই। এবারের নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম নয়। বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয় থাকায় সাধারণ ভোটারদের আগ্রহও চোখে পড়ার মতো।
এই প্রেক্ষাপটে একের পর এক অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং সংবাদ সম্মেলন নির্বাচনী উত্তাপ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ঘটনা ভোটের শেষ মুহূর্তে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে সাবিরা সুলতানা মুন্নির পাশে ছিলেন জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকনসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের একাধিক নেতা। তাদের উপস্থিতি সংবাদ সম্মেলনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তোলে।
নেতারা সবাই এক কণ্ঠে জামায়াত প্রার্থীর অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে আখ্যায়িত করেন এবং শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান জানান। তারা বলেন, জনগণ সবকিছু দেখছে এবং সময় হলে সঠিক জবাব ব্যালটের মাধ্যমেই দেবে।
এই সব ঘটনার মাঝেও সাধারণ ভোটারদের প্রত্যাশা একটাই। তারা চান শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে। অনেক ভোটারের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ব্যক্তিগত আক্রমণ ও মিথ্যা অভিযোগের রাজনীতি বাদ দিয়ে উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলা।
যশোর-২ আসনের মানুষ এখন তাকিয়ে আছে সামনে আসা ভোটের দিনের দিকে। কে কতটা বিশ্বাসযোগ্য, কে সত্য বলছে, আর কে কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে—এই বিচার শেষ পর্যন্ত করবেন ভোটাররাই।
সব মিলিয়ে বলা যায়, যশোর-২ আসনে জামায়াত ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি অভিযোগ নির্বাচনী রাজনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এই উত্তেজনার শেষ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ভোটের ফলাফল পর্যন্ত।


