বাংলাদেশের রাজনীতিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে সামনে এসেছে। দীর্ঘ সময় পর তুলনামূলকভাবে নির্বাচনমুখী পরিবেশ তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষের আগ্রহ যেমন বেড়েছে, তেমনি আলোচনায় এসেছে রাজনৈতিক দলগুলোর বাস্তব শক্তি ও সংগঠনিক সক্ষমতার বিষয়টি। নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে এবার ৯টি দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। এই অনুপস্থিতি শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, বরং দেশের রাজনীতিতে বিকল্প শক্তির সংকট এবং দলীয় কাঠামোর দুর্বলতার দিকটিও সামনে নিয়ে এসেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না তৃণমূল বিএনপি, বিএনএম, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগ, আওয়ামী লীগ, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, ন্যাপ, ওয়ার্কার্স পার্টি এবং বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন। এদের মধ্যে কয়েকটি দল দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে পরিচিত হলেও মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম সীমিত। আবার আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানের পর দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
এই বাস্তবতা ভোটারদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে—নিবন্ধন থাকলেই কি একটি রাজনৈতিক দল বাস্তব শক্তি হয়ে ওঠে? অনেক দল কাগজে-কলমে সক্রিয় থাকলেও নির্বাচনের সময় প্রার্থী দিতে না পারা সেই প্রশ্নের উত্তর নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে অধিকাংশই সীমিত সংখ্যক আসনে প্রার্থী দিয়েছে। ২৯টি দল মাত্র ১ থেকে ২০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ১০০ আসনে প্রার্থী দিতে পেরেছে মাত্র ৫টি দল। বড় দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ৩৩১টি, জামায়াতে ইসলামী ২৭৬টি, জাতীয় পার্টি ২২৪টি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৬৮টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। গণঅধিকার পরিষদ ১০০টির বেশি আসনে প্রার্থী দিতে সক্ষম হয়েছে, যা তাদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে এই হিসাবও পুরোপুরি স্থির নয়। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বড় দলগুলোর মধ্যে আসন ভাগাভাগির সমীকরণে শেষ মুহূর্তে অনেক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এতে ছোট দলগুলোর জন্য রাজনৈতিক জায়গা আরও সংকুচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন নানা বিতর্কে জড়িয়েছে। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অনেক দল অংশ নেয়নি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে দলগুলো অংশ নিলেও অবাধ ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সেই অভিজ্ঞতার পর এবারের নির্বাচনকে অনেকেই একটি নতুন সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন পর ভোটের আমেজ ফিরে আসায় নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। তবে একই সঙ্গে তারা বলছেন, নিবন্ধিত হলেও অনেক ছোট দল নির্বাচনে অংশ নিতে না পারা প্রমাণ করে যে দেশে কার্যকর রাজনৈতিক বিকল্প এখনও তৈরি হয়নি।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করেন, একটি রাজনৈতিক দলের শক্তি শুধু নিবন্ধন বা নামের ওপর নির্ভর করে না। মাঠপর্যায়ে কর্মসূচি, সাংগঠনিক কাঠামো এবং জনগণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগই আসল ভিত্তি। বাস্তবতা হলো, অনেক ছোট দল নির্বাচন এলেই তৎপর হয়ে ওঠে, কিন্তু বছরের বাকি সময় তাদের উপস্থিতি প্রায় চোখে পড়ে না।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলি মনে করেন, নিবন্ধিত দলগুলোর অন্তত ১০ শতাংশ আসনে প্রার্থী দেওয়া উচিত ছিল। বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। তাঁর মতে, দেশে প্রকৃত অর্থে কার্যকর রাজনৈতিক বিকল্প খুব সীমিত। কয়েকটি বড় দলের বাইরে অধিকাংশ দলের কর্মকাণ্ড নিয়মিত ও দৃশ্যমান নয়।
নিবন্ধনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো নানা শর্ত পূরণ করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই শর্ত বজায় রাখার প্রবণতা কমে যায়। নিয়মিত কাউন্সিল, অফিস কার্যক্রম, কর্মীসভা—এসব অনেক দলের ক্ষেত্রেই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। জেসমিন টুলির মতে, যদি নির্বাচন কমিশন নিয়মিত মাঠপর্যায়ে দলগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে, তাহলে অনেক দল বাধ্য হয়ে হলেও নিজেদের সংগঠন শক্তিশালী করতে উদ্যোগ নেবে।
একটি উদাহরণ ধরলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। কোনো দোকান শুধু লাইসেন্স নিলেই যদি বছরের পর বছর বন্ধ থাকে, তাহলে সেটি যেমন প্রকৃত ব্যবসা নয়, তেমনি রাজনৈতিক দলও শুধু নিবন্ধন থাকলেই কার্যকর শক্তি হয়ে ওঠে না।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, অনেক ছোট দল মূলত সুযোগ-সুবিধা আদায়ের জন্য রাজনীতি করে। ক্ষমতাশীল দলের লোকজনকে সামনে এনে কর্মসূচি পালন, নাম প্রচার কিংবা ব্যক্তিগত পরিচিতি বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। এতে রাজনীতির আদর্শিক জায়গা দুর্বল হয়ে পড়ে।
এবার জোটগতভাবে নির্বাচন হলেও দলীয় প্রতীক ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হচ্ছে। আদর্শ ও জনসম্পৃক্ততা ছাড়া কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক দল গঠনের প্রবণতা ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
সাধারণ ভোটারদের কাছে এবারের নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের প্রশ্ন নয়। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতারও একটি পরীক্ষা। যারা নিয়মিত মাঠে কাজ করেছে, মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের প্রতি আস্থা তৈরি হয়েছে। আর যারা কেবল নির্বাচনের সময় হাজির হয়, তাদের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
অনেক ভোটার বলছেন, তারা এবার নাম নয়, কাজ দেখে ভোট দিতে চান। এই মনোভাব ভবিষ্যতে রাজনীতির ধারা বদলে দিতে পারে, যদি দলগুলো বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। নিবন্ধিত দল থাকা সত্ত্বেও ৯টি দলের নির্বাচনে অনুপস্থিতি প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে হলে কাগজের চেয়ে মাঠের কাজ বেশি জরুরি। বড় দলগুলোর পাশাপাশি সত্যিকারের বিকল্প শক্তি গড়ে উঠতে হলে নিয়মিত কার্যক্রম, আদর্শিক স্পষ্টতা এবং জনগণের সঙ্গে গভীর সংযোগ অপরিহার্য।
এই নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কেবল বিজয়ী নির্ধারণ করবে না, বরং কোন দলগুলো ভবিষ্যতের রাজনীতিতে টিকে থাকবে, সেই দিকটিও স্পষ্ট করে দেবে।


