ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসন এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। এই আসনে একদিকে আছে বিএনপির জোটপ্রার্থী রশিদ আহমাদ, অন্যদিকে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ নেতা শহীদ মো. ইকবাল হোসেন। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন গাজী এনামুল হক। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মামলা, সম্পদ ও আয়ের দিক থেকে তিন প্রার্থীর অবস্থান একেবারেই ভিন্ন। এই পার্থক্যই ভোটারদের কৌতূহল বাড়াচ্ছে।
যশোর-৫ আসনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
যশোর-৫, অর্থাৎ মণিরামপুর উপজেলা, দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। এখানে দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীর শক্ত অবস্থান নতুন কিছু নয়। এবারের নির্বাচনে বিএনপি সরাসরি দলীয় নেতা না দিয়ে জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা রশিদ আহমাদকে মনোনয়ন দিয়েছে। এতে দলের ভেতরেই দেখা দিয়েছে অসন্তোষ। সেই অসন্তোষ থেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহীদ মো. ইকবাল হোসেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী শহীদ মো. ইকবাল হোসেনের সম্পদ ও মামলা চিত্র
শহীদ মো. ইকবাল হোসেন পেশায় একজন ব্যবসায়ী। হলফনামা অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে মোট ৩৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে ১৫টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বাকি মামলাগুলোতে তিনি খালাস বা অব্যাহতি পেয়েছেন। মামলার সংখ্যার দিক থেকে তিনি এই আসনের সবচেয়ে আলোচিত প্রার্থী।
আয়ের ক্ষেত্রে শহীদ ইকবাল হোসেনের বার্ষিক আয় ৫ লাখ ৮ হাজার ৪শ’ টাকা। কৃষি, বাড়িভাড়া, ব্যবসা ও আইন পরামর্শ—এই চারটি উৎস থেকে তার আয় আসে। বিশেষ করে ব্যবসা ও আইন পরামর্শ থেকে তার আয় তুলনামূলক বেশি।
সম্পদের দিক থেকেও তিনি এগিয়ে। তার অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য প্রায় ৫৩ লাখ টাকা। নগদ অর্থ, ব্যাংক জমা, যানবাহন, ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও আসবাবপত্র মিলিয়ে এই হিসাব দাঁড়িয়েছে। স্থাবর সম্পদের পরিমাণ আরও বড়। প্রায় আড়াই কোটি টাকার জমি ও ভবনের মালিক তিনি। এর মধ্যে রয়েছে পৈত্রিক কৃষি জমি, অকৃষি জমি ও ভবন। এছাড়া উপহার হিসেবে পাওয়া উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বর্ণের কথাও হলফনামায় উল্লেখ আছে।
তার স্ত্রী মেরি ইকবাল গৃহিণী। তার আয় সীমিত হলেও স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ হলফনামায় দেখানো হয়েছে। এতে পরিবারিকভাবে শহীদ ইকবালের আর্থিক অবস্থান স্পষ্ট হয়।
বিএনপি জোটপ্রার্থী রশিদ আহমাদের আর্থিক ও আইনি অবস্থান
বিএনপি মনোনীত জোটপ্রার্থী রশিদ আহমাদ শিক্ষাগতভাবে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। পেশাগত জীবনে তিনি শিক্ষকতা ও কৃষির সঙ্গে যুক্ত। তার বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা, যা অন্য দুই প্রার্থীর তুলনায় কম।
অস্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রে রশিদ আহমাদের মোট সম্পদের মূল্য প্রায় ১২ লাখ টাকা। এর বড় অংশই নগদ অর্থ। এছাড়া একটি মোটরসাইকেল, কিছু ইলেকট্রনিক পণ্য ও আসবাবপত্র এবং সীমিত পরিমাণ স্বর্ণের উল্লেখ রয়েছে। স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে পৈত্রিক কৃষি জমি, অকৃষি জমি ও একটি একতলা ভবন।
আইনি দিক থেকে রশিদ আহমাদের অবস্থান তুলনামূলক স্বচ্ছ। তার নামে একটি মামলা থাকলেও সেটিতে তিনি আগেই খালাস পেয়েছেন। ফলে মামলা সংক্রান্ত ঝুঁকি তার ক্ষেত্রে অনেকটাই কম।
জামায়াত প্রার্থী গাজী এনামুল হকের আয় ও মামলা বিশ্লেষণ
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী গাজী এনামুল হক পেশায় একজন আইনজীবী। তার বিরুদ্ধে মোট ১৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে তিনটি মামলা বিচারাধীন। মামলার সংখ্যায় তিনি শহীদ ইকবালের চেয়ে কম হলেও রশিদ আহমাদের তুলনায় অনেক বেশি।
আয়ের ক্ষেত্রে গাজী এনামুল হক এগিয়ে। আইন পেশা থেকে তার বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা, যা এই তিন প্রার্থীর মধ্যে সর্বোচ্চ। অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ তুলনামূলক কম হলেও নগদ অর্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য।
স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে প্রায় ২৮ লাখ টাকার জমি ও ভবন। তার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদের মূল্য নির্দিষ্ট করে উল্লেখ না থাকলেও সম্পত্তির অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়েছে। তার স্ত্রী সামছুন নাহার গৃহিণী হলেও তার নামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য হলফনামায় রয়েছে।
মামলা, সম্পদ ও আয়ের তুলনামূলক চিত্র
তিন প্রার্থীর হলফনামা পাশাপাশি রাখলে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। শহীদ ইকবাল হোসেন সম্পদের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে, তবে মামলার সংখ্যাও তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি। রশিদ আহমাদ মামলার দিক থেকে সবচেয়ে কম ঝুঁকিতে থাকলেও আয় ও সম্পদে পিছিয়ে। আর গাজী এনামুল হক আয়ের দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও মামলা ও সম্পদের দিক থেকে মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছেন।
ভোটারদের জন্য কী বার্তা দেয় এই তথ্য
নির্বাচনের সময় ভোটাররা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, প্রার্থীর ব্যক্তিগত স্বচ্ছতা, আয়-ব্যয় ও আইনি অবস্থানও বিবেচনায় নেন। যশোর-৫ আসনে এই তিন প্রার্থীর হলফনামা বিশ্লেষণ ভোটারদের সামনে পরিষ্কার একটি চিত্র তুলে ধরেছে। কে কতটা আর্থিকভাবে স্বচ্ছ, কার আইনি ঝুঁকি কতটা—এসব তথ্য ভোটের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনের লড়াই শুধু দলীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে ব্যক্তিগত প্রভাব, আর্থিক শক্তি ও আইনি অবস্থান মিলিয়ে একটি জটিল কিন্তু আগ্রহজাগানিয়া নির্বাচনী সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ভোটাররা কাকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নেন।


