বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন মানেই আলোচনা, বিতর্ক আর আগ্রহ। বিশেষ করে ভোটের পদ্ধতিতে সামান্য পরিবর্তন এলেও মানুষ জানতে চায়—এটার মানে কী, এতে লাভ হবে নাকি ক্ষতি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঠিক এমনই একটি শব্দ আবার আলোচনায় এসেছে— হাইব্রিড নো ভোট। নামটা শুনে অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগছে, এটা আসলে কী? আগের ‘না ভোট’-এর সঙ্গে এর পার্থক্যই বা কোথায়? চলুন সহজ করে পুরো বিষয়টা বুঝে নেওয়া যাক।
‘না ভোট’ মানে কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
ধরুন আপনি ভোটকেন্দ্রে গেলেন। ব্যালট পেপারে কয়েকজন প্রার্থীর নাম। কিন্তু কাউকেই আপনার যোগ্য মনে হচ্ছে না। আগে এমন হলে ভোট না দিয়ে ঘরে ফিরে যেতেন অনেকেই। এখানেই ‘না ভোট’-এর ধারণা আসে। অর্থাৎ, আপনি কাউকে পছন্দ না করলেও আপনার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। ব্যালটে একটি আলাদা ঘর থাকবে, যেখানে লেখা থাকবে—“উপরের কাউকেই নয়”।
এই ব্যবস্থার মূল ভাবনাটা খুব সাধারণ। ভোটার যেন জোর করে কাউকে বেছে নিতে বাধ্য না হন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ তৈরি হয়, তারা যেন সৎ, যোগ্য আর গ্রহণযোগ্য প্রার্থী দেয়।
বাংলাদেশে ‘না ভোট’-এর শুরু যেভাবে
বাংলাদেশে প্রথমবার ‘না ভোট’ চালু হয় ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। তখন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এটিএম শামছুল হুদার নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন বড় ধরনের সংস্কার আনে। ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, আরপিও সংশোধন—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত হয় ‘না ভোট’।
সেই নির্বাচনে সব আসনের ব্যালট পেপারেই ‘না ভোট’ ছিল। নিয়ম ছিল খুব স্পষ্ট। যদি কোনো আসনে মোট প্রদত্ত ভোটের অর্ধেক বা তার বেশি ‘না ভোট’ হয়, তাহলে সেখানে আবার নতুন করে নির্বাচন দিতে হবে। ভাবুন তো, কী শক্তিশালী একটা বার্তা! ভোটাররা সরাসরি বলতে পারতেন—এই প্রার্থীদের কাউকেই আমরা চাই না।
২০০৮ সালের অভিজ্ঞতা কী বলেছিল
২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রায় সাত কোটি মানুষ ভোট দিয়েছিলেন। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন লাখ ভোট পড়েছিল ‘না ভোট’-এ। সবচেয়ে বেশি ‘না ভোট’ পড়েছিল রাঙামাটি আসনে। তবে কোনো আসনেই ‘না ভোট’ সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়নি। তাই পুনর্নির্বাচনের দরকার পড়েনি।
তবু বিশ্লেষকরা বলেন, এই ব্যবস্থার ফলে ভোটারদের অংশগ্রহণ বেড়েছিল। অনেকেই শুধু ‘না ভোট’ দেওয়ার সুযোগ থাকার কারণেই কেন্দ্রে গিয়েছিলেন। এটা ছিল গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক একটি সংকেত।
কেন ‘না ভোট’ তুলে দেওয়া হয়েছিল
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর আরপিও সংশোধন করা হয়। সেই সংশোধনেই বাদ পড়ে যায় ‘না ভোট’-এর বিধান। এর কিছুদিন পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও বাতিল হয়।
এর ফল কী হয়েছিল, তা আমরা ২০১৪ সালের নির্বাচনে দেখেছি। বিএনপি-জামায়াত জোটসহ অনেক দল নির্বাচন বর্জন করায় ১৫৩টি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। ভোট ছাড়াই সংসদ সদস্য হওয়া—এ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ‘না ভোট’ থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না।
আবার ‘না ভোট’ ফিরল, তবে নতুন রূপে
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। সংস্কার কমিশন স্পষ্টভাবে সুপারিশ করে—সব আসনে, যতজন প্রার্থীই থাকুক, ব্যালটে ‘না ভোট’ রাখতে হবে। অর্থাৎ, সার্বজনীন বা ইউনিভার্সাল নো ভোট।
নির্বাচন কমিশন সেই সুপারিশ আংশিকভাবে গ্রহণ করে। আর এখান থেকেই জন্ম নেয় নতুন ধারণা— হাইব্রিড নো ভোট।
হাইব্রিড নো ভোট আসলে কী
সহজ ভাষায় বললে, হাইব্রিড নো ভোট মানে আংশিক ‘না ভোট’। এই পদ্ধতিতে শুধু সেই সব আসনে ব্যালটে ‘না ভোট’ থাকবে, যেখানে একজন মাত্র প্রার্থী রয়েছেন। অর্থাৎ, একক প্রার্থী থাকলে তাকে আর বিনা ভোটে বিজয়ী ঘোষণা করা যাবে না। ভোট হবে, আর ভোটার চাইলে ‘না ভোট’ দিতে পারবেন।
কিন্তু যেখানে একাধিক প্রার্থী থাকবেন, সেখানে ‘না ভোট’ থাকবে না। ভোটারদের কাউকে না কাউকে বেছে নিতেই হবে। এই কারণেই একে বলা হচ্ছে হাইব্রিড বা মিশ্র পদ্ধতি।
কেন এই পদ্ধতি বেছে নিল নির্বাচন কমিশন
নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো পুরোপুরি সার্বজনীন ‘না ভোট’ চালুর জন্য প্রস্তুত নয়। কমিশনের মতে, আপাতত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় ঠেকানোই প্রধান লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্য পূরণে হাইব্রিড নো ভোট কার্যকর হতে পারে।
একজন কমিশনারের কথায়, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিবেশ আরও পরিপক্ব হলে ইউনিভার্সাল নো ভোটের কথাও ভাবা যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের আপত্তি কোথায়
অনেক নির্বাচন বিশ্লেষকই এই পদ্ধতিকে অসম্পূর্ণ মনে করছেন। তাঁদের যুক্তি খুব সরল। একজন ভোটারের সব প্রার্থীই অপছন্দ হতে পারে, এমনকি একাধিক প্রার্থী থাকলেও। তখন সে কী করবে? হাইব্রিড নো ভোট সেই মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে না।
বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এমন আংশিক ‘না ভোট’-এর উদাহরণও খুব একটা নেই। তাই কেউ কেউ বলছেন, এটা সমস্যার অস্থায়ী সমাধান মাত্র।
বাস্তবে এবারের নির্বাচনে কী হচ্ছে
এবারের নির্বাচনে মনোনয়ন যাচাই শেষে দেখা গেছে, কোনো আসনেই একক প্রার্থী নেই। গড়ে প্রতি আসনে ছয়জনের মতো প্রার্থী রয়েছেন। ফলে হাইব্রিড নো ভোট কার্যত প্রয়োগই হচ্ছে না। কারণ একক প্রার্থী না থাকলে ব্যালটে ‘না ভোট’ রাখার দরকার পড়ছে না।
এই অবস্থায় কেউ কেউ বলছেন, যদি সার্বজনীন ‘না ভোট’ থাকত, তাহলে ভোটার উপস্থিতি আরও বাড়তে পারত। বিশেষ করে এমন এক নির্বাচনে, যেখানে বড় একটি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে না।
ভবিষ্যতের জন্য বার্তা কী
হাইব্রিড নো ভোট আপাতত একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। এটি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় ঠেকাতে পারে, কিন্তু ভোটারের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করে না। গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো ভোটারের স্বাধীন পছন্দ। সেই পছন্দের সুযোগ যদি সীমিত থাকে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা কোন পথে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দলগুলোর আচরণ আর ভোটারদের সচেতনতার ওপর। হাইব্রিড নো ভোট হয়তো একটি ধাপ, কিন্তু শেষ গন্তব্য নয়—এ কথা বলছেন অনেকেই।
সব মিলিয়ে, ‘হাইব্রিড নো ভোট’ আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থার একটি নতুন অধ্যায়। এটি কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আলোচনা, বিতর্ক আর সচেতনতা—এই তিনটিই গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেয়। আর এই আলোচনা থেকেই হয়তো ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী, আরও ন্যায্য একটি ভোট ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।


