মুম্বইয়ের ব্যস্ত শহরে রাতের নীরবতা ভেঙে হঠাৎ আতঙ্ক। জনপ্রিয় নেটপ্রভাবী ও অভিনেত্রী উর্ফী জাভেদের জীবনে সম্প্রতি ঘটে গেল এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। গভীর রাতে তাঁর আবাসনের দরজায় একাধিক পুরুষের উপস্থিতি, অনবরত কলিং বেল বাজানো এবং দরজা খুলতে চাপ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে চরম ভীতিকর। এই ঘটনায় শুধু উর্ফী নন, শহরের নারী নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
মধ্যরাতে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির শুরু
সোমবার গভীর রাত। ঘড়িতে তখন প্রায় সাড়ে তিনটে। উর্ফী জাভেদ নিজের বাড়িতে ছিলেন দুই বোন ডলি ও আসফির সঙ্গে। হঠাৎ করেই দরজার কলিং বেল বারবার বাজতে শুরু করে। প্রথমে বিষয়টি উপেক্ষা করলেও, মিনিটের পর মিনিট ধরে একই ঘটনা ঘটতে থাকায় ভয় বাড়তে থাকে। দরজার বাইরে কয়েক জন পুরুষ দাঁড়িয়ে আছেন—এমন আভাস পান তিনি।
উর্ফীর দাবি, শুধু কলিং বেল বাজানোতেই থামেননি ওই ব্যক্তিরা। দরজা খুলতে তাঁকে চাপ দিতে থাকেন। একজন দরজার সামনে স্পষ্টভাবে দাঁড়িয়েছিলেন, আরেকজন নাকি আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন। এই আচরণ পরিস্থিতিকে আরও সন্দেহজনক করে তোলে।
দরজা না খুলতেই বাড়ে চাপ ও হুমকি
উর্ফী জানিয়েছেন, তিনি একাধিকবার অনুরোধ করেন যেন ওই ব্যক্তিরা দরজার সামনে থেকে সরে যান। কিন্তু তাঁরা নাছোড়বান্দা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। বরং কথাবার্তায় ধীরে ধীরে হুমকির সুর স্পষ্ট হতে থাকে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁরা নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে বলে দাবি করেন এবং যা খুশি করতে পারেন—এমন কথাও বলেন।
এই মুহূর্তে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। রাতের অন্ধকারে, একা বাড়িতে থাকা মেয়েদের জন্য এই পরিস্থিতি কতটা ভয়ানক হতে পারে, তা সহজেই বোঝা যায়। উর্ফীর ভাষায়, এমন সময় মাথা ঠান্ডা রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
পুলিশে অভিযোগের হুমকিতে পরিস্থিতির মোড়
দীর্ঘক্ষণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকার পর উর্ফী শেষ পর্যন্ত পুলিশে ফোন করার হুমকি দেন। তখনই পরিস্থিতিতে সামান্য পরিবর্তন আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, পুলিশে খবর দেওয়ার কথা শুনে ওই ব্যক্তিরা কিছুটা পিছিয়ে যান এবং শেষে সরে পড়েন।
তবে এখানেই ঘটনা শেষ নয়। ভোরবেলায় উর্ফী থানায় গিয়ে পুরো বিষয়টি জানিয়ে অভিযোগ দায়ের করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই ঘটনার পর তিনি আর নিজেকে নিরাপদ বোধ করছেন না।
পুলিশের সামনেও দুর্ব্যবহার করার অভিযোগ
উর্ফীর অভিযোগ আরও গুরুতর। তিনি জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর পরেও অভিযুক্তরা রূঢ় আচরণ করেন। পুলিশের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করা হয় বলে দাবি। এমনকি তাঁদের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলার মতো দুঃসাহসও দেখান ওই ব্যক্তিরা।
সব অভিযোগ অস্বীকার করার পাশাপাশি, তাঁরা নাকি সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে তা মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। যদি এই অভিযোগ সত্যি হয়, তবে বিষয়টি নিঃসন্দেহে আরও উদ্বেগজনক।
সামাজিক মাধ্যমে উর্ফীর স্পষ্ট বার্তা
ঘটনার পর উর্ফী জাভেদ সামাজিক মাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। তাঁর লেখায় স্পষ্ট আতঙ্ক আর ক্ষোভ। তিনি জানান, রাত তিনটের সময় কোনও নারীর দরজায় এসে দরজা খুলতে বলা মানেই ভয় পাওয়ার মতো পরিস্থিতি। দরজা না খুললেও যদি কেউ দীর্ঘক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে আতঙ্ক বহুগুণ বেড়ে যায়।
তিনি আরও লেখেন, মেয়েরা যখন একা থাকে, তখন এই ধরনের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
নারী নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন
এই ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, বড় শহরেও নারী নিরাপত্তা কতটা নাজুক। উন্নত আবাসন, সিসিটিভি, নিরাপত্তারক্ষী—সব থাকার পরেও যদি একজন পরিচিত মুখ এমন অভিজ্ঞতার শিকার হন, তবে সাধারণ নারীদের অবস্থা সহজেই কল্পনা করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাতের সময় আবাসনে প্রবেশের ক্ষেত্রে আরও কড়া নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে, বাসিন্দাদের সচেতনতা ও দ্রুত পুলিশের সহযোগিতা নেওয়াও অত্যন্ত জরুরি।
আইনি পদক্ষেপ ও পরবর্তী করণীয়
উর্ফী জাভেদ ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছেন। পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বলে জানা গিয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং ফোন কলের তথ্য—সবকিছু খতিয়ে দেখে তদন্ত এগোচ্ছে।
আইনজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ঘটনায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তবেই ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে, অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে সমাজে স্পষ্ট বার্তা যাবে।
শেষ কথা
উর্ফী জাভেদের এই অভিজ্ঞতা শুধু একজন নেটপ্রভাবীর ব্যক্তিগত ঘটনা নয়। এটি শহুরে সমাজে নারীদের প্রতিদিনের অজানা আতঙ্কের প্রতিচ্ছবি। রাতের নিস্তব্ধতায় দরজার বাইরে অচেনা উপস্থিতি যে কতটা ভয় ধরাতে পারে, তা এই ঘটনায় আবারও সামনে এল।
এখন দেখার, তদন্ত কত দ্রুত এগোয় এবং দোষীরা কতটা শাস্তি পায়। তবে একটাই সত্য—নারী নিরাপত্তা নিয়ে আর কোনও আপস নয়। এই ঘটনাই সেই বাস্তবতার জোরালো প্রমাণ।


