দক্ষিণী চলচ্চিত্র জগতে ফের বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এলেন সুপারস্টার যশ। তাঁর আসন্ন ছবি ‘টক্সিক: আ ফেয়ারিটেল ফর গ্রোন আপস’-এর টিজার মুক্তির পর থেকেই শুরু হয়েছে প্রবল সমালোচনা। অন্ধকার জগতের গল্প, গ্যাংস্টার সংস্কৃতি আর অতিরিক্ত যৌন দৃশ্যের মিশেলে তৈরি এই টিজারকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে কর্ণাটকের মহিলা কমিশন ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। অভিযোগ উঠেছে, এই টিজার কন্নড় সংস্কৃতি ও ভারতীয় নৈতিক মূল্যবোধকে চরমভাবে অপমান করেছে।
‘টক্সিক’ টিজার কেন বিতর্কের কেন্দ্রে
৮ জানুয়ারি মুক্তি পাওয়া ‘টক্সিক’ টিজারে যশকে একেবারে নতুন রূপে দেখা যায়। বিস্ফোরণ, গুলির শব্দ, অন্ধকার গ্যাংস্টার জগৎ—সবকিছুর মাঝেই দেখানো হয়েছে উন্মুক্ত যৌন দৃশ্য। বিশেষ করে গোরস্থানের ভেতরে রতিসুখের দৃশ্য বহু দর্শকের কাছে চরম আপত্তিকর বলে মনে হয়েছে। অনেকের মতে, এই ধরনের দৃশ্য কেবল অপ্রয়োজনীয় নয়, বরং সাংস্কৃতিকভাবে আঘাত হানার শামিল।
টিজারটি কোনও প্রকার সতর্কীকরণ বা বয়সসীমা ছাড়াই সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
কর্ণাটক মহিলা কমিশনের কড়া অবস্থান
এই বিতর্কে সবচেয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছে কর্ণাটকের মহিলা কমিশন। কর্ণাটকের আম আদমি পার্টির মহিলা শাখা কমিশনের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে। তাঁদের বক্তব্য, ‘টক্সিক’ টিজার সরাসরি ভারতীয় সংস্কৃতিকে কলুষিত করছে এবং নারীদের সামাজিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করছে।
আপ-এর কর্ণাটক রাজ্য সম্পাদক ঊষা মোহন জানান, এই ধরনের অশ্লীল কনটেন্ট শিশু ও কিশোরদের মানসিক বিকাশে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর মতে, সোশাল মিডিয়ায় অবাধে এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়া অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা।
সোশাল মিডিয়ায় অশ্লীল কনটেন্ট নিয়ে উদ্বেগ
বর্তমান সময়ে সোশাল মিডিয়া খুব সহজেই সব বয়সের মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কোনও কনটেন্টে যদি যথাযথ সতর্কীকরণ না থাকে, তাহলে তা শিশুদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। ‘টক্সিক’ টিজারের ক্ষেত্রেও ঠিক এই অভিযোগই উঠেছে।
মহিলা কমিশনের দাবি, রাজ্য সরকার এবং সেন্সর বোর্ড অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করে এই টিজার সব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে নিক। তাঁরা মনে করেন, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ব বজায় রাখা নির্মাতাদের অন্যতম কর্তব্য।
কন্নড় সংস্কৃতি অপমানের অভিযোগ
শুধু মহিলা কমিশনই নয়, কন্নড় সমাজের একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিও এই টিজারের বিরোধিতা করেছেন। সমাজকর্মী দীনেশ কাল্লাহাল্লি সেন্সর বোর্ডে আলাদা করে অভিযোগ দায়ের করেছেন। তাঁর বক্তব্য, এই টিজার শালীনতা ও নৈতিকতার সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করেছে।
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের কনটেন্ট ভারতীয় সংবিধানের ১৯(১)(ক) ধারার আওতায় বাকস্বাধীনতার সুরক্ষা পায় না। বরং ১৯(২) ধারার অধীনে এই ধরনের বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য। তাঁর মতে, এটি কন্নড় সংস্কৃতির প্রতি সরাসরি অসম্মান।
আইনি পথে যাওয়ার হুঁশিয়ারি
দীনেশ কাল্লাহাল্লি স্পষ্ট জানিয়েছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে তিনি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হবেন। এই হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে ‘টক্সিক’ সিনেমার মুক্তির আগেই আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সেন্সর বোর্ড বা রাজ্য সরকার কোনও পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে এই বিতর্ক দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং সিনেমার ব্যবসার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
যশের জনপ্রিয়তা বনাম বিতর্ক
যশ মানেই বক্স অফিসে ঝড়। ‘কেজিএফ’ সিরিজ তাঁকে প্যান-ইন্ডিয়া সুপারস্টার বানিয়েছে। সেই জনপ্রিয়তার জোরেই ‘টক্সিক’ টিজার মুক্তির পর বিপুল দর্শক টেনেছে। অনেকেই যশের সাহসী অভিনয় আর নতুন লুকের প্রশংসা করেছেন।
তবে একই সঙ্গে এই টিজার প্রমাণ করে দিয়েছে, জনপ্রিয়তা থাকলেও সামাজিক দায়িত্ব এড়ানো যায় না। দর্শকের একাংশ মনে করছেন, শুধু চমক তৈরি করার জন্য এই ধরনের দৃশ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
সেন্সর বোর্ডের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
এই গোটা ঘটনায় সেন্সর বোর্ডের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের দাবি, টিজার মুক্তির আগেই এই ধরনের কনটেন্ট যাচাই করা উচিত ছিল। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পাওয়া কনটেন্টের ক্ষেত্রে আরও কড়া নিয়ম প্রয়োজন।
বর্তমানে ওটিটি ও সোশাল মিডিয়ার যুগে সেন্সরশিপ নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
‘টক্সিক’ সিনেমার মুক্তির ভবিষ্যৎ
‘টক্সিক: আ ফেয়ারিটেল ফর গ্রোন আপস’ আগামী ২০২৬ সালের ১৯ মার্চ বিশ্বজুড়ে মুক্তি পাওয়ার কথা। তার আগেই এই বিতর্ক সিনেমাটিকে ব্যাপক প্রচারের আলোয় এনে দিয়েছে। প্রশ্ন একটাই—এই বিতর্ক কি ছবির সাফল্যে সাহায্য করবে, নাকি বাধা হয়ে দাঁড়াবে?

অনেক সময় বিতর্ক সিনেমার প্রতি কৌতূহল বাড়ায়। আবার কখনও তা নেতিবাচক প্রভাবও ফেলে। ‘টক্সিক’-এর ক্ষেত্রে কোনটা হবে, সেটাই এখন দেখার।
যশের ‘টক্সিক’ টিজার শুধু একটি সিনেমার ঝলক নয়, এটি সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও শিল্পের স্বাধীনতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। একদিকে সৃষ্টিশীল স্বাধীনতা, অন্যদিকে সামাজিক দায়িত্ব—এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আগামী দিনে সেন্সর বোর্ড ও রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তই ঠিক করবে, এই বিতর্ক কোন দিকে মোড় নেয়। তবে এটুকু স্পষ্ট, ‘টক্সিক’ ইতিমধ্যেই দক্ষিণী সিনেমা জগতে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।


