এক সময় যে সিনেমা সিরিজ পুরো একটি প্রজন্মের প্রেম, ফ্যান্টাসি আর ভ্যাম্পায়ার কল্পনাকে নতুন করে সংজ্ঞা দিয়েছিল, সেই ‘টোয়াইলাইট’ আবার ফিরতে পারে নতুন রূপে। আর সবচেয়ে বড় চমক—এই রিমেকের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী স্বয়ং ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট। যিনি একসময় বেলা স্বান চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি হলিউডের শীর্ষ তারকাদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিলেন।
‘টোয়াইলাইট’ আর ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট: এক আবেগের নাম
২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘টোয়াইলাইট’ শুধু একটি রোমান্টিক ভ্যাম্পায়ার সিনেমা ছিল না। এটি ছিল তরুণদের আবেগ, ভালোবাসা আর আত্মপরিচয়ের গল্প। বেলা স্বান আর এডওয়ার্ড কালেনের সম্পর্ক, তাদের টানাপোড়েন, নিষিদ্ধ প্রেম—সব মিলিয়ে সিনেমাটি তৈরি করেছিল আলাদা এক সংস্কৃতি।
এই সিরিজের মাধ্যমেই ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট পেয়েছিলেন বিশ্বব্যাপী পরিচিতি। একজন ইন্ডি-ঘরানার অভিনেত্রী থেকে তিনি হয়ে ওঠেন মেইনস্ট্রিম হলিউড তারকা। তাই ‘টোয়াইলাইট’ তার ক্যারিয়ারের শুধু একটি অধ্যায় নয়, বরং এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
রিমেক নিয়ে মুখ খুললেন ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট
সম্প্রতি ইউএসএ টুডের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ‘টোয়াইলাইট’ রিমেক করার বিষয়ে নিজের আগ্রহের কথা স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট। এন্টারটেইনমেন্ট টুনাইটকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তিনি সত্যিই এই প্রজেক্টটি করতে চান।
ক্রিস্টেন জানান, মূল ‘টোয়াইলাইট’ সিনেমার পরিচালক ক্যাথরিন হার্ডউইকের কাজ তিনি ভীষণভাবে পছন্দ করেন। পাশাপাশি ক্রিস উইটজসহ সিরিজের অন্য পরিচালকদের কাজও তার কাছে দারুণ লেগেছে। তার মতে, প্রত্যেক পরিচালকই ছিলেন নিজেদের মতো করে আলাদা এবং সৃষ্টিশীল।
এই প্রসঙ্গে ক্রিস্টেন বলেন, যদি সুযোগ আসে, তিনি চান এই রিমেকটি বড় বাজেটে তৈরি হোক এবং ভক্তদের পূর্ণ সমর্থন পাক। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, সুযোগ পেলে তিনি অবশ্যই এই সিনেমা রিমেক করবেন এবং পুরো দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজটি করতে চান।
পরিচালক হিসেবে ক্রিস্টেন স্টুয়ার্টের নতুন যাত্রা
এক সময় শুধু অভিনেত্রী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট। কিন্তু এখন তিনি নিজেকে প্রমাণ করছেন একজন পরিচালক হিসেবেও। সম্প্রতি ‘দ্য ক্রোনোলজি অফ ওয়াটার’ সিনেমার মাধ্যমে পরিচালনায় অভিষেক ঘটেছে তার।
এই সিনেমাটি একজন নারীর জীবনের গভীর ও সংবেদনশীল গল্প তুলে ধরে। শৈশবের ট্রমা, মানসিক ক্ষত, এবং সেখান থেকে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই—সবকিছুই ফুটে উঠেছে ছবিটিতে। সাতার এবং লেখার মাধ্যমে নিজের ভেতরের যন্ত্রণা সামাল দেওয়ার গল্পটি সমালোচকদের দারুণ প্রশংসা কুড়িয়েছে।
এই কাজের সুবাদেই ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট জায়গা করে নিয়েছেন ২০২৬ সালের ভ্যারাইটি ম্যাগাজিনের ‘দশজন নজরকাড়া পরিচালক’-এর তালিকায়। যা স্পষ্ট করে দেয়, পরিচালনা নিয়ে তার ভাবনা এখন আর শখের পর্যায়ে নেই।
‘টোয়াইলাইট’ রিমেক: কী বদলাতে পারেন ক্রিস্টেন?
যদি ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট সত্যিই ‘টোয়াইলাইট’ রিমেক করেন, তাহলে সেটি যে আগের মতো হবে না, তা প্রায় নিশ্চিত। কারণ তিনি এখন যে ধরনের গল্পে আগ্রহী, তা অনেক বেশি বাস্তবধর্মী, গভীর এবং মানসিক স্তরে প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
সম্ভবত রিমেকে বেলা স্বান চরিত্রটি আরও শক্তিশালী, স্বাধীন এবং জটিল মানসিক কাঠামোর হতে পারে। প্রেমের গল্পের পাশাপাশি চরিত্রগুলোর ভেতরের দ্বন্দ্ব, ভয় এবং সিদ্ধান্তের গুরুত্ব আরও বেশি গুরুত্ব পেতে পারে।
এছাড়া বর্তমান প্রজন্মের দর্শকদের কথা মাথায় রেখে গল্প বলার ধরনেও আসতে পারে বড় পরিবর্তন। ভ্যাম্পায়ার ফ্যান্টাসির সঙ্গে বাস্তব জীবনের অনুভূতি ও মনস্তত্ত্বের মেলবন্ধন দেখা যেতে পারে।
রবার্ট প্যাটিনসনের অনীহা?
তবে সবকিছু এতটা সহজ নয়। ‘টোয়াইলাইট’ মানেই শুধু ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট নন, এডওয়ার্ড কালেন মানেই রবার্ট প্যাটিনসন। কিন্তু রিমেকের প্রশ্নে প্যাটিনসনের অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।
২০২২ সালে জিকিউকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রবার্ট প্যাটিনসন জানান, ‘টোয়াইলাইট’ সেটে কাজ করার সময় তিনি অনেক ক্ষেত্রেই বিরক্ত ছিলেন। তার মতে, স্টুডিও তার শিল্পীসত্তার দৃষ্টিভঙ্গিকে পুরোপুরি গ্রহণ করেনি।
তিনি বলেছিলেন, তিনি চাইতেন সিনেমাটি আরও শিল্পমুখী হোক। কিন্তু স্টুডিও চাইছিল সেটিকে বেশি আবেগপূর্ণ ও বাণিজ্যিক রাখতে। এই মতপার্থক্যের কারণে নিজের অভিনয় নিয়েও অনেক সময় তিনি আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন।
এই অভিজ্ঞতার পর প্যাটিনসন আবার ‘টোয়াইলাইট’ জগতে ফিরতে কতটা আগ্রহী হবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
কোন সিনেমা দিয়ে শুরু হতে পারে রিমেক?
ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট এখনো স্পষ্ট করে জানাননি, তিনি ‘টোয়াইলাইট’ সিরিজের কোন অংশটি রিমেক করতে চান। তবে হলিউড সংশ্লিষ্ট মহলে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি প্রথম সিনেমাটি দিয়েই শুরু করতে পারেন।
কারণ প্রথম ‘টোয়াইলাইট’ সিনেমাটিই ছিল পুরো গল্পের ভিত্তি। বেলা ও এডওয়ার্ডের প্রথম দেখা, তাদের সম্পর্কের সূচনা এবং ভ্যাম্পায়ার জগতের পরিচয়—সবকিছুই সেখানে ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
‘টোয়াইলাইট’ সিরিজের সাফল্যের ইতিহাস
মূল ‘টোয়াইলাইট’ সিনেমার পর আরও চারটি সিক্যুয়েল মুক্তি পায়। ২০০৯ সালে আসে ‘নিউ মুন’, ২০১০ সালে ‘ইক্লিপস’, এরপর ২০১১ সালে ‘ব্রেকিং ডন – পার্ট ১’ এবং ২০১২ সালে ‘ব্রেকিং ডন – পার্ট ২’।
এই পাঁচটি সিনেমা মিলিয়ে বিশ্বব্যাপী আয় করেছিল তিন বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। শুধু বক্স অফিস নয়, বই বিক্রি, ফ্যান কমিউনিটি, মার্চেন্ডাইজ—সব দিক থেকেই এটি ছিল এক বিশাল ফ্র্যাঞ্চাইজি।
ভক্তদের প্রত্যাশা আর নতুন চ্যালেঞ্জ
‘টোয়াইলাইট’ রিমেক মানেই বিশাল প্রত্যাশা আর সমান বড় চ্যালেঞ্জ। পুরোনো ভক্তরা চাইবেন তাদের প্রিয় আবেগ অক্ষুণ্ণ থাকুক। আবার নতুন প্রজন্ম চাইবে আধুনিক গল্প বলার ধরন।
এই দুই প্রজন্মের মাঝামাঝি সেতুবন্ধন তৈরি করাই হবে ক্রিস্টেন স্টুয়ার্টের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। তবে যেভাবে তিনি এখন নিজের কাজ বেছে নিচ্ছেন, তাতে অনেকেই মনে করছেন—এই ঝুঁকি নেওয়ার সাহস তার আছে।
শেষ কথা
‘টোয়াইলাইট’ শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি এক যুগের অনুভূতি। আর সেই অনুভূতিকে নতুনভাবে, নতুন চোখে তুলে ধরতে চাইছেন সেই অভিনেত্রীই, যিনি একসময় এই গল্পের প্রাণ ছিলেন।
ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট যদি সত্যিই ‘টোয়াইলাইট’ রিমেক করেন, তাহলে তা নিঃসন্দেহে হবে হলিউডের সবচেয়ে আলোচিত প্রজেক্টগুলোর একটি। এখন দেখার বিষয়, এই স্বপ্ন কবে বাস্তবে রূপ নেয় এবং ভ্যাম্পায়ারদের সেই জাদু আবার পর্দায় ফিরতে পারে কিনা।


