নারী সুরক্ষা, সম্মান আর নিরাপত্তা—এই তিনটি শব্দ আমাদের সমাজে বারবার উচ্চারিত হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়। বছর বদলালেও মানসিকতা বদলায় না, এমন কথাই যেন আবার প্রমাণিত হল অভিনেত্রী মৌনী রায়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতায়। ভরা মঞ্চে, শত শত মানুষের সামনে মৌনীর সঙ্গে যে অশালীন আচরণ করা হয়েছে, তা শুধু একজন অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত যন্ত্রণার গল্প নয়। এটি সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা নারীবিদ্বেষের নগ্ন রূপ। আর সেই ঘটনায় ক্ষোভে গর্জে উঠেছেন টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়।
নতুন বছর এলেই আমরা নতুন শুরুর কথা বলি। নতুন আশা, নতুন লক্ষ্য, নতুন সমাজের স্বপ্ন দেখি। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই কঠিন। ২০২৬ সালে পা রেখেও নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে একই প্রশ্ন, একই ক্ষোভ। শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে ঠিক এই জায়গাতেই আঘাত করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, সময় বদলালেও নারীদের হেনস্তা বন্ধ হয়নি। সমাজের কোন স্তরের মহিলা, তিনি কী কাজ করেন, কতটা পরিচিত—এসব কিছুই এখানে গুরুত্ব পায় না। নারীকে এখনও অনেকেই ভোগ্যপণ্য হিসেবেই দেখে।
শুভশ্রীর কথায় ছিল ক্ষোভ, ছিল হতাশা, আবার ছিল শক্তি জোগানোর বার্তাও। মৌনীকে উদ্দেশ্য করে তিনি লেখেন, এই অভিজ্ঞতার কথা শুনে তাঁর রক্ত ফুটছে। একই সঙ্গে তিনি মৌনীর সাহসিকতাকে কুর্নিশ জানিয়েছেন। কারণ চুপ করে না থেকে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করাটাই আজ সবচেয়ে বড় লড়াই।
মৌনী রায় নিজেই সোশাল মিডিয়ায় বিস্তারিতভাবে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েছিলেন তিনি। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই ঘটে যায় প্রথম অস্বস্তিকর ঘটনা। মঞ্চের দিকে হাঁটার সময়, সেখানে উপস্থিত দু’জন বয়স্ক অতিথি, যাদের তিনি ‘কাকু’ বলে উল্লেখ করেছেন, তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতে চান। ছবি তোলার অজুহাতে তাঁরা মৌনীর কোমরে হাত দেন। এই স্পর্শ মৌনীর কাছে সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অসম্মানজনক ছিল।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ জানান। স্পষ্ট করে বলেন, হাত সরাতে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেখানেই বিষয়টি শেষ হয়নি।
অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে পারফর্ম করার সময় ওই দুই ব্যক্তি অশালীন অঙ্গভঙ্গি করতে থাকেন। প্রথমে মৌনী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। ভদ্রভাবে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চান। কিন্তু যখন তাঁরা তাঁর দিকে গোলাপের পাঁপড়ি ছোড়া শুরু করেন, তখন বিষয়টি আর নিছক বিরক্তিকর থাকেনি। এটি স্পষ্টতই অসম্মানজনক হয়ে ওঠে।
এক সময় পরিস্থিতি এতটাই অসহনীয় হয়ে যায় যে মৌনী মাঝপথেই মঞ্চ ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও পরে আবার অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ করার জন্য মঞ্চে ফিরে আসেন। তাঁর ফিরে আসার পরেই ওই অভব্য আচরণ কিছুটা থামে।
মৌনীর অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। তিনি জানান, মঞ্চটি বেশ উঁচুতে ছিল। সেই সুযোগ নিয়ে ওই দুই ব্যক্তি নিচ থেকে লো অ্যাঙ্গেলে ছবি তুলছিলেন। এই বিষয়টি অনুষ্ঠানে উপস্থিত একজনের নজরে পড়ে। তিনি তাঁদের বারণ করেন। তখনই তারা আচরণ বন্ধ করে।
এই পুরো ঘটনায় মৌনী নিজেকে লজ্জিত এবং আতঙ্কিত বলে উল্লেখ করেছেন। একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রী হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা ভাবতেই শিউরে ওঠে। তিনি স্পষ্টভাবে দাবি করেছেন, এই ধরনের অভব্য আচরণের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
মৌনীর এই সাহসী স্বীকারোক্তির পরই শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় প্রকাশ্যে তাঁর পাশে দাঁড়ান। সোশাল মিডিয়ায় তিনি লেখেন, মৌনী শুধু নিজের হয়ে কথা বলেননি। তিনি সকল নারীর প্রতিনিধি হয়ে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন। শুভশ্রীর বার্তায় ছিল এক ধরনের বোনত্বের অনুভূতি। যেন তিনি বলছেন, তুমি একা নও।
শুভশ্রী নিজেও যে ট্রোলিং এবং কটাক্ষের শিকার হয়েছেন, তা নতুন কিছু নয়। সোশাল মিডিয়ায় তাঁকে বহুবার আক্রমণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই তিনি প্রতিবাদ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো তিনি আরও গভীরভাবে মৌনীর যন্ত্রণাটা অনুভব করতে পেরেছেন।
এই ঘটনা আমাদের আবারও ভাবতে বাধ্য করে। ভরা মঞ্চে, আলো-ঝলমলে অনুষ্ঠানে যদি একজন নারী নিরাপদ না হন, তাহলে সাধারণ নারীর অবস্থা কী? কর্মক্ষেত্র, রাস্তাঘাট, গণপরিবহন—সব জায়গাতেই নারীদের সতর্ক হয়ে চলতে হয়। সমস্যা শুধু আইন বা শাস্তির অভাবে নয়। মূল সমস্যা মানসিকতায়।
অনেকেই এখনও মনে করেন, বয়স বা সামাজিক অবস্থান থাকলে কিছু করা যায়। ‘কাকু’ পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই মানসিকতাই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ এতে ভুক্তভোগীর প্রতিবাদ করাও কঠিন হয়ে যায়।
এই ঘটনার পরেও এখনও স্পষ্ট নয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না। মৌনী নিজে কর্তৃপক্ষের কাছে পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে সেই দাবি কতটা কার্যকর হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
প্রতিবার এমন ঘটনার পর আমরা ক্ষোভ প্রকাশ করি, সোশাল মিডিয়ায় আলোচনা হয়, কিছুদিন পরে সব চুপচাপ। কিন্তু যদি প্রতিবারই দোষীদের জবাবদিহির আওতায় আনা না হয়, তাহলে এই চক্র ভাঙবে না।
মৌনী রায়ের অভিজ্ঞতা আর শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রতিবাদ একসঙ্গে আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট বার্তা রাখে। সময় এসেছে চুপ করে থাকার সংস্কৃতি ভাঙার। প্রতিবাদ করাই অপরাধ নয়, বরং অন্যায়কে মেনে নেওয়াটাই সবচেয়ে বড় অপরাধ।
নারীরা আজ আর শুধু সহ্য করার জন্য তৈরি নন। তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, আওয়াজ তুলছেন। সমাজ যদি সত্যিই এগোতে চায়, তাহলে এই আওয়াজ শুনতেই হবে। নইলে নতুন বছর এলেও পুরনো লজ্জাই বারবার আমাদের সামনে ফিরে আসবে।


