বলিউডে এক যুগেরও বেশি সময় কাটিয়ে ফেলেছেন সানি লিওনে। কাজ করেছেন বহু ছবি, আইটেম নম্বর থেকে শুরু করে মুখ্য চরিত্রেও দেখা গিয়েছে তাঁকে। ভারতীয় দর্শকের কাছে তিনি এখন পরিচিত নাম। তবু বারবার তাঁর অতীতই যেন সামনে চলে আসে। নতুন বছর শুরুর আগেই ফের সেই পুরনো বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেন সানি লিওনে। উত্তরপ্রদেশের মথুরায় নববর্ষের যে অনুষ্ঠান ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেটি বাতিলই হয়ে গেল। প্রশ্ন উঠছে, কী এমন ঘটল যে শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য হল আয়োজকেরা?
নববর্ষে মথুরায় অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা
পরিকল্পনা ছিল বেশ বড়সড়। ইংরেজি নববর্ষের রাতে মথুরার একটি পানশালায় বিশেষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা ছিল সানি লিওনের। রাতভর পার্টি, গান-বাজনা আর ডিজে নাইট—সব মিলিয়ে জমজমাট আয়োজন। সেখানেই ডিজের ভূমিকায় দেখা যাওয়ার কথা ছিল অভিনেত্রীকে।
নিজেও এই অনুষ্ঠান নিয়ে ভীষণ উচ্ছ্বসিত ছিলেন সানি। একটি প্রচারমূলক ভিডিয়োয় তিনি বলেছিলেন, মথুরায় এসে নতুন বছর উদ্যাপন করতে তিনি মুখিয়ে আছেন। তাঁর আশা ছিল, সেই রাত সবার জন্যই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সব ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই বদলে যায় পরিস্থিতি।
পুরোহিত সংগঠনের তীব্র আপত্তি
মথুরা মানেই বৃন্দাবন, কৃষ্ণভক্তি আর পবিত্র তীর্থস্থান। সারা বছর দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী এখানে আসেন। এই শহরের ধর্মীয় ভাবাবেগ খুবই সংবেদনশীল। সেখানেই শুরু হয় আপত্তি।
মথুরার একাধিক মন্দিরের পুরোহিত সংগঠন একযোগে এই অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তাঁদের দাবি, এ ধরনের অনুষ্ঠান মথুরার মতো পবিত্র শহরে মানানসই নয়। সংগঠনের তরফ থেকে লিখিত অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয় প্রশাসনের কাছে।
“পবিত্র ভূমির গরিমা নষ্ট করা হচ্ছে”—চিঠিতে কী লেখা ছিল?
পুরোহিত সংগঠনের অভিযোগ ছিল কড়া ভাষায়। চিঠিতে বলা হয়, মথুরা শুধুই একটি শহর নয়, এটি একটি পবিত্র ভূমি। এখানে ধর্মীয় বিশ্বাস জড়িয়ে আছে মানুষের আবেগের সঙ্গে। তাঁদের মতে, কিছু মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে এই পবিত্র স্থানের সুনাম নষ্ট করার চেষ্টা করছেন।
চিঠিতে আরও বলা হয়, এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা হচ্ছে। একটি পবিত্র শহরকে ‘কালিমালিপ্ত’ করার এবং তার ঐতিহ্য নষ্ট করার চেষ্টা চলছে। এই অভিযোগ সামনে আসতেই চাপের মুখে পড়ে যান আয়োজকেরা।
আয়োজকদের সিদ্ধান্ত: অনুষ্ঠান বাতিল
অভিযোগপত্র জমা পড়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। বিতর্ক আরও বড় হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট পানশালার তরফে নববর্ষের গোটা অনুষ্ঠান বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রশাসনিক ঝামেলা এবং ধর্মীয় উত্তেজনা এড়াতেই এই পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।
এর ফলে মথুরায় সানি লিওনের নববর্ষের অনুষ্ঠান আর হওয়া হল না। মুহূর্তের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। শুরু হয় নতুন করে আলোচনা।
বারবার অতীতের ছায়া কেন পিছু ছাড়ে না?
সানি লিওনের জীবনের গল্প অনেকটাই খোলা বই। ‘বিগ বস’-এর মাধ্যমে ভারতীয় টেলিভিশনে পা রাখা। তার পরে পরিচালক মহেশ ভট্টের হাত ধরে বলিউডে আত্মপ্রকাশ। সেই সময় থেকে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি নানা ব্যবসায়িক উদ্যোগেও সফল হয়েছেন।
তবু বাস্তবতা হলো, তাঁর অতীত পরিচয় আজও অনেকের চোখে বড় হয়ে ওঠে। যে কোনও বিতর্ক হলেই সেটি টেনে আনা হয়। মথুরার এই ঘটনায়ও অনেকের মতে, সানি লিওনের উপস্থিতিকেই আপত্তির মূল কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে।
ধর্ম, সংস্কৃতি আর বিনোদনের সংঘাত
এই ঘটনা নতুন কিছু নয়। ভারতের বহু শহরেই ধর্মীয় ভাবাবেগ আর আধুনিক বিনোদনের মধ্যে সংঘাত দেখা যায়। বিশেষ করে মথুরা, কাশী বা অযোধ্যার মতো জায়গায় এ ধরনের অনুষ্ঠান নিয়ে আগেও আপত্তি উঠেছে।
এক পক্ষ মনে করেন, ধর্মীয় শহরে কিছু সীমা মানা উচিত। অন্য পক্ষের যুক্তি, আইন মেনে অনুষ্ঠান হলে সেখানে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্ন আসে। সানি লিওনের অনুষ্ঠান বাতিল হওয়া সেই পুরনো বিতর্ককেই আবার সামনে এনে দিল।
সানি লিওনের প্রতিক্রিয়া কী?
এই ঘটনা নিয়ে এখনও প্রকাশ্যে কোনও কড়া মন্তব্য করেননি সানি লিওনে। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, তিনি এই সিদ্ধান্তে হতাশ। কারণ অনুষ্ঠানটি পেশাদার ভাবেই আয়োজন করা হচ্ছিল এবং কোনও ধর্মীয় স্থানে নয়, একটি বেসরকারি পানশালায়।
তবু পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝেই আয়োজকেরা পিছিয়ে আসেন। সানিও বিষয়টি মেনে নিয়েছেন বলেই জানা যাচ্ছে।
শেষ কথা
মথুরায় নববর্ষের অনুষ্ঠান বাতিল হওয়া শুধু একটি ইভেন্ট বাতিলের গল্প নয়। এটি ভারতের সমাজে চলতে থাকা বড় একটি আলোচনার অংশ। পবিত্রতা, সংস্কৃতি আর আধুনিক বিনোদনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই চিরাচরিত দ্বন্দ্ব।
সানি লিওনে আজ একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রী। তবু তাঁর নাম এলেই আবেগ আর বিতর্ক একসঙ্গে জড়িয়ে যায়। এই ঘটনাও তার ব্যতিক্রম নয়। নতুন বছরে এই বিতর্ক থামবে কি না, সেটাই এখন দেখার।


