সাম্প্রতিক সময়ে একটা প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যায়—মানুষ কেন আর আগের মতো সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখতে চান না? অনেকেই সহজ উত্তর দেন, “ওটিটি এসে গেছে বলেই।” কিন্তু বলিউডের আইকনিক অভিনেত্রী মাধুরী দীক্ষিত এই ব্যাখ্যাকে পুরোপুরি মানতে নারাজ। তাঁর মতে, সিনেমা হলে দর্শক কমার পেছনে ওটিটির চেয়েও বড় এবং বাস্তব একটা কারণ রয়েছে।
একটি সাক্ষাৎকারে নিজের অভিজ্ঞতা আর পর্যবেক্ষণ থেকে মাধুরী স্পষ্ট করে বলেছেন, সমস্যার মূল জায়গাটা অন্যখানে। আর সেই কথাগুলো আজকের দর্শকদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই মিলে যায়।
ওটিটি নয়, অন্য জায়গায় খুঁজতে বলছেন মাধুরী
সংবাদ সংস্থা আইএএনএস-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাধুরী দীক্ষিত বলেন, শুধুমাত্র ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য মানুষ সিনেমা হল থেকে দূরে সরে যাচ্ছে—এমনটা বলা ঠিক নয়। তাঁর মতে, আজকের জীবনের ছন্দটাই বদলে গেছে। মানুষ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যস্ত।
মাধুরী মনে করেন, কাজের চাপ, অফিস টাইম, যাতায়াত—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের দিন শেষ হতে হতে রাত সাড়ে আটটা বা ন’টা বেজে যায়। এই সময়টার পরে আবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে সিনেমা হলে যাওয়া অনেকের কাছেই কঠিন হয়ে পড়ে।
ভাবুন তো, সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে আবার ভিড়, ট্রাফিক আর লাইন সামলে হলে ঢোকা—ইচ্ছে থাকলেও বাস্তবে সেটা করা সহজ নয়। মাধুরীর কথায়, এখানেই প্রথম বড় সমস্যা।
সিনেমা হলে যাওয়ার সময়টাই নেই অনেকের
মাধুরী দীক্ষিত বলছেন, আজকের দিনে সাধারণ মানুষের কাছে সিনেমা হলে যাওয়ার সবচেয়ে বাস্তব সুযোগ থাকে সপ্তাহান্তে। শনিবার বা রবিবার ছাড়া অধিকাংশ মানুষ হলে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারেন না।
কিন্তু সমস্যা হলো, সপ্তাহান্তে সময় থাকলেও সবাই যে হলে যাবেন, এমনটা আর হচ্ছে না। ইচ্ছে থাকলেও অনেকেই নিজেকে আটকে রাখছেন। আর সেই জায়গাতেই আসে দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বড় কারণ।
আসল সমস্যা টিকিটের দাম
মাধুরীর মতে, সিনেমা হলে দর্শক কমার সবচেয়ে বড় কারণ হলো টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম। আজকাল হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে গেলে শুধু টিকিট নয়, সঙ্গে আরও অনেক খরচ জুড়ে যায়।
একটা সাধারণ হিসাব করলেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়। ধরুন, একটি পরিবার বা বন্ধুদের দল সিনেমা দেখতে গেল। টিকিটের দামই অনেক জায়গায় কয়েকশো টাকা। তার সঙ্গে পপকর্ন, কোল্ড ড্রিঙ্ক—সব মিলিয়ে খরচটা সহজেই হাজার টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
মাধুরী বলছেন, এই জায়গায় এসে অনেক মানুষকে বাজেটের কথা ভাবতেই হয়। ইচ্ছা থাকলেও পকেট সায় দেয় না। তাই সিনেমা হলের দরজায় গিয়েই অনেক দর্শক পিছিয়ে আসেন।
ভালো সিনেমা হচ্ছে, তবু হলে যাচ্ছেন না দর্শক
এই আলোচনায় মাধুরী আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন। তাঁর মতে, এখনো অনেক ভালো সিনেমা তৈরি হচ্ছে। কনটেন্টের অভাব নেই। গল্প, অভিনয়, পরিচালনা—সব দিক থেকেই ভালো কাজ হচ্ছে বলেই তিনি মনে করেন।
কিন্তু সমস্যা হলো, সেই ভালো সিনেমাগুলো হলে গিয়ে দেখার ক্ষেত্রে মানুষের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। কারণটা আবারও সেই একই জায়গায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে—খরচ।
৫৮ বছর বয়সী এই তারকার মতে, টিকিটের দাম যদি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই দর্শক হলমুখী হবেন না।
কম খরচে বিনোদনের সহজ রাস্তা ওটিটি
এখানে এসে মাধুরী ওটিটির কথাও স্বীকার করেন, তবে অন্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। তিনি বলেন, মানুষ ওটিটিকে বেছে নিচ্ছেন কারণ সেখানে কম খরচে বিনোদনের সুযোগ পাওয়া যায়।
ওটিটিতে বসে মানুষ নিজের সুবিধামতো সময়েই সিনেমা দেখতে পারেন। কাউকে নির্দিষ্ট শো টাইম ধরতে হয় না। মাঝপথে থামানো যায়, আবার পরে দেখা যায়। সবচেয়ে বড় কথা, একবার সাবস্ক্রিপশন নিলেই অনেক সিনেমা আর সিরিজ দেখা যায়, অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই।
মাধুরীর মতে, সিনেমা হলে অনেক টাকা খরচ করে একটা সিনেমা দেখার চেয়ে মানুষ তাই ওটিটিকেই বেশি সুবিধাজনক মনে করছেন। এখানে পছন্দের স্বাধীনতাও আছে, আর বাজেটের চাপও কম।
ওটিটি বনাম সিনেমা হল: লড়াইটা আসলে কোথায়
মাধুরীর বক্তব্য থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার—এটা ওটিটি বনাম সিনেমা হলের লড়াই নয়। আসল লড়াইটা হচ্ছে দর্শকের সময় আর টাকার সঙ্গে।
যদি সিনেমা হলে যাওয়া সহজ হয়, খরচটা যুক্তিসংগত হয়, তাহলে এখনও অনেক মানুষ বড় পর্দার অভিজ্ঞতা উপভোগ করতে চান। কারণ বড় পর্দার আবেশ, হলের সাউন্ড, দর্শকদের সঙ্গে একসঙ্গে হাসা-কাঁদার অনুভূতি—এই অভিজ্ঞতা ওটিটিতে পুরোপুরি পাওয়া যায় না।
কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার দাম যদি সাধারণ দর্শকের নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প পথ বেছে নেবেন।
বলিউডের জন্য সতর্কবার্তা?
অনেকেই মনে করছেন, মাধুরী দীক্ষিতের এই মন্তব্য আসলে ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটা সতর্কবার্তা। দর্শক এখনও সিনেমা ভালোবাসে, কিন্তু তাঁদের বাস্তব সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব না দিলে হলের আসন ফাঁকাই থাকবে।
শুধু বড় তারকা বা বড় বাজেটের সিনেমা বানালেই হবে না। দর্শককে হলে ফিরিয়ে আনতে হলে টিকিটের দাম, শো টাইম, সামগ্রিক অভিজ্ঞতা—সব কিছু নিয়েই নতুন করে ভাবতে হবে।
মাধুরীর বক্তব্যের সারকথা
সব মিলিয়ে মাধুরী দীক্ষিত যা বলতে চেয়েছেন, তার সারবত্তা খুবই সহজ। মানুষ সিনেমা হলকে ভালোবাসা বন্ধ করেনি। কিন্তু সময়ের অভাব আর অতিরিক্ত খরচ তাদের পিছিয়ে দিচ্ছে।
টিকিটের দাম যদি এমনই থাকে, তাহলে সাধারণ দর্শক সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখা থেকে মুখ ঘোরাবেন—এটাই স্বাভাবিক। আর সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে ওটিটি হয়ে উঠছে সহজ, সস্তা আর সুবিধাজনক বিকল্প।


