পাখির কথা শুনলেই আমরা সাধারণত কী ভাবি? নীল আকাশে ওড়া, গাছের ডালে বসে মিষ্টি ডাক, মন ভালো করে দেওয়া এক শান্ত দৃশ্য। কিন্তু ভাবতে পারো, সেই পাখিই যদি হঠাৎ তাড়া করে বসে? এমন তাড়া, যে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে রাস্তায় প্রায় দৌড়ে পালাতে হয়! ঠিক এমনই অদ্ভুত আর কিছুটা ভয়ের ঘটনা ঘটেছে Ottawa শহরে।
ঘটনাটি শুনলে অবাকই হতে হবে। দু’টি টার্কির ভয়ে এক ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নিলেন একেবারে অচেনা এক নারীর গাড়িতে। নিজের নিরাপত্তার জন্য এর বাইরে আর কোনো উপায় ছিল না তাঁর।
সেদিন শহরের অনেকটাই বরফে ঢেকে ছিল। রাস্তার মাঝখান কিছুটা পরিষ্কার, কিন্তু দু’পাশে সাদা বরফের স্তর। এমন পরিবেশে এক ব্যক্তি নিশ্চিন্তে হাঁটছিলেন। সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। হঠাৎ করেই দু’টি বুনো টার্কি তাঁর পিছু নেয়।
প্রথমে হয়তো তিনি ভেবেছিলেন, পাখি তো, একটু কাছে আসছে। কিন্তু বিষয়টা দ্রুত অন্য রূপ নেয়। টার্কি দু’টি একেবারে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে তাঁর দিকে এগোতে থাকে। যেন তাঁকে তাড়িয়েই ছাড়বে।
ভাবো তো, তুমি একা রাস্তায় হাঁটছ, চারপাশে বরফ, আর হঠাৎ দু’টি বড়সড় পাখি ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে তোমার দিকে ছুটে আসছে। বুক ধড়ফড় করাটা স্বাভাবিক, তাই না?
প্রথমে ওই ব্যক্তি সাহস করেই পাখি দু’টিকে তাড়ানোর চেষ্টা করেন। হাত নাড়েন, শব্দ করেন। সাধারণত পাখি এতে ভয় পেয়ে সরে যায়। কিন্তু এখানে ঘটল উল্টোটা।
টার্কি দু’টি আরও এগিয়ে আসে। যেন তারা পিছিয়ে যাওয়ার বদলে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে।
অবস্থা বেগতিক দেখে তিনি বরফে জোরে পা মারতে থাকেন। বরফ উড়ে গিয়ে পড়ে টার্কিগুলোর ওপর। এটা একধরনের আত্মরক্ষার কৌশল ছিল। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি। বরং পাখি দু’টির তাড়া আরও বেড়ে যায়।
এই মুহূর্তে তিনি বুঝে যান, বিষয়টা আর মজা নয়। এটা সত্যিই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
যখন দেখলেন টার্কি দু’টি একেবারেই পিছু ছাড়ছে না, তখন তিনি প্রায় দৌড়ে রাস্তায় এগোতে থাকেন। কিন্তু পাখি দু’টিও পিছু ছাড়েনি।
শেষ পর্যন্ত এক সাহসী সিদ্ধান্ত নেন তিনি। রাস্তা দিয়ে যাওয়া এক গাড়ির দরজা খুলে সরাসরি ভেতরে ঢুকে পড়েন। গাড়িতে ছিলেন এক অচেনা মহিলা।
এখানেই গল্পে আসে মানবিকতার দারুণ এক দিক। মহিলা তাঁকে বের করে দেননি, প্রশ্নে জর্জরিত করেননি। পরিস্থিতি বুঝে গাড়ি চালিয়ে সামনে এগিয়ে যান। গাড়ি চলতে শুরু করতেই টার্কি দু’টি আর ধাওয়া করেনি।
এক মুহূর্ত ভেবে দেখো, যদি সেই গাড়ি না থাকত? যদি গাড়ির চালক দরজা না খুলতেন? তখন কী হতো, বলা কঠিন।
অনেকেই ভাবেন, টার্কি মানে শান্ত পাখি। কিন্তু বাস্তবে বুনো টার্কি মাঝে মাঝে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে প্রজনন মৌসুমে বা যখন তারা নিজেদের এলাকা রক্ষা করতে চায়, তখন তারা মানুষকেও প্রতিপক্ষ ভাবতে পারে।
টার্কিরা আকারে বেশ বড় হয়। তাদের ডানা ঝাপটানো, ফুলে ওঠা পালক আর দ্রুতগতির দৌড়—সব মিলিয়ে তারা ভয় ধরিয়ে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, কখনো কখনো মানুষকে তারা প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে তাড়া করে।
তাই এমন পরিস্থিতিতে শান্ত থাকা, ধীরে সরে যাওয়া আর সরাসরি চোখে চোখ না রাখা অনেক সময় কাজে দেয়। তবে ওই ব্যক্তির ক্ষেত্রে টার্কিগুলো এতটাই আগ্রাসী ছিল যে সাধারণ কৌশল কাজ করেনি।
এই ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেন। মানুষ অবাক হয়ে দেখে, কীভাবে দু’টি পাখি একজন মানুষকে রাস্তায় তাড়া করছে।
অনেকেই মজা পেয়েছেন, আবার অনেকেই বলেছেন—ঘটনাটি যতটা হাস্যকর মনে হয়, বাস্তবে ততটাই ভয়ের ছিল। কারণ টার্কির ঠোকর বা ডানার আঘাতেও গুরুতর চোট লাগতে পারে।
আমরা প্রায়ই ভাবি, পাখি মানেই শান্তি, প্রকৃতি মানেই প্রশান্তি। কিন্তু প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম আছে। কোনো প্রাণী যখন নিজেকে বা নিজের এলাকা হুমকির মুখে মনে করে, তখন সে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতেই পারে।
এই ঘটনার মাধ্যমে একটা বিষয় পরিষ্কার—শহুরে পরিবেশেও বন্যপ্রাণীর আচরণ কখনো কখনো অপ্রত্যাশিত হতে পারে। তাই সচেতন থাকা জরুরি।
এই পুরো ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হলো সেই অচেনা নারীর সহানুভূতি। তিনি যদি দরজা বন্ধ করে দিতেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত।

অচেনা একজন মানুষ বিপদে পড়েছেন বুঝে তাঁকে আশ্রয় দেওয়া—এটাই তো আসল মানবিকতা। শহরের ঠান্ডা বরফের মধ্যে এই মানবিক উষ্ণতাই ঘটনাটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
Ottawa শহরের এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবন কখন কোন অদ্ভুত পরিস্থিতি সামনে এনে দাঁড় করায়, তা বলা যায় না। কখনো দু’টি পাখিও হয়ে উঠতে পারে বড় আতঙ্কের কারণ।
তবে একই সঙ্গে এটা দেখায়, অচেনা মানুষের সহানুভূতি কত বড় আশ্রয় হতে পারে। প্রকৃতির অপ্রত্যাশিত আচরণ আর মানুষের মানবিকতা—এই দুইয়ের মিশ্রণেই ঘটনাটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
ভাবলে অবাক লাগে, দিনের এক সাধারণ হাঁটাচলা কীভাবে মুহূর্তেই রোমাঞ্চকর আর ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় পরিণত হতে পারে!


