মানুষের মানসিক অবসাদ কখনো কখনো এমন চরম রূপ নেয় যে স্বাভাবিক জীবনযাত্রাই স্তব্ধ হয়ে যায়। থাইল্যান্ডের এক মধ্যবয়সী ব্যক্তির বিয়োগান্তক মৃত্যু এই ঘটনারই প্রমাণ।
ডিভোর্সের যন্ত্রণা: একাকিত্বের অন্ধকার গহ্বর
৪৪ বছরের এই ব্যক্তি, যাঁর নাম গোপন রাখা হয়েছে, স্ত্রীকে হারানোর বেদনা কিছুতেই সহ্য করতে পারেননি। স্ত্রী ছেড়ে চলে যাওয়া তাঁর কাছে শুধু সম্পর্কের বিচ্ছেদ নয়, পুরো জীবনের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার শামিল ছিল।
ডিভোর্সের পর থেকে তিনি আর কোনও খাবার মুখে তুলতে পারেননি। দিনের পর দিন তিনি একটাই সঙ্গী বেছে নেন—বিয়ার। তিনবেলার খাবার, জল—সবকিছুর জায়গা নেয় কেবল বিয়ার।
বছরের পর বছর গড়ে ওঠা অভ্যাস: বিয়ারে ডুবে থাকা
প্রথমে বন্ধুবান্ধব ভেবেছিলেন, কিছুদিনের জন্যই হয়তো এমন হবে। কিন্তু দিন পেরোতে থাকল, এক মাস অতিক্রম করল, তবু তাঁর হাতে কেবল বিয়ারের বোতল। ঘরের মেঝেতে আর হাঁটার জায়গা নেই—১০০-এর বেশি বিয়ারের খালি বোতল ছড়িয়ে রয়েছে চারপাশে।
কিশোর ছেলের নিরলস চেষ্টা
সবচেয়ে বেদনাদায়ক এই ঘটনার আরেক প্রান্তে রয়েছে তাঁর ১৬ বছরের ছেলে। মায়ের অনুপস্থিতিতে বাবা-ই ছিল তার একমাত্র ভরসা। স্কুল থেকে ফিরে সে বাবাকে রান্না করে খাওয়ানোর চেষ্টা করেছে। একাধিকবার অনুরোধ করেছে, বুঝিয়েছে—শরীরের যত্ন না নিলে কী হতে পারে। কিন্তু বাবা তখন স্ত্রী বিরহে এতটাই নিমজ্জিত যে ছেলের কথাও তাঁর কাছে মূল্যহীন হয়ে যায়।
শরীর ভেঙে পড়া: মদ্যপানের বিষক্রিয়া
একটানা মদ্যপান শরীরের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে বিপর্যস্ত করে তোলে। জল, খাবার, পুষ্টির অভাবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হতে শুরু করে। বিয়ার যতই লঘু মনে হোক না কেন, দিনে গড়ে ২০-৩০ বোতল বিয়ার শরীরে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। যকৃত, কিডনি, মস্তিষ্ক—সবই ধীরে ধীরে অচল হতে থাকে।
চূড়ান্ত পরিণতি: ছেলের চোখের সামনে মৃত্যু
একদিন স্কুল থেকে ফিরে ছেলে দেখে বাবা অচেতন অবস্থায় শুয়ে আছেন। তড়িঘড়ি খবর যায় প্যারামেডিক টিমের কাছে। তাঁরা এসে পরীক্ষা করে দেখেন, ততক্ষণে আর কিছুই করার নেই। বিয়ার আর একাকিত্ব মিলে তাঁকে শেষ করে দিয়েছে।
মানসিক স্বাস্থ্য: সম্পর্ক ও সমাজের দায়
এই মর্মান্তিক ঘটনায় একটি প্রশ্ন বারবার উঠে আসে—মানুষ একা হলে তার পাশে কে দাঁড়াবে? একাকিত্ব থেকে জন্মানো বিষণ্ণতা কত ভয়ানক হতে পারে, এই ঘটনা তার উদাহরণ।
বিয়োগের ক্ষত থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একজন মানুষের প্রয়োজন পরিবার, বন্ধু, এবং প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য। কিন্তু অনেকেই এই সহায়তা চাওয়ার সাহস পান না। ফলে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে মৃত্যু ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।
মদ্যপান: ক্ষণিকের মুক্তি, চিরন্তন ক্ষতি
বিয়ার বা যে কোনও মদ্যপান সাময়িকভাবে ব্যথা ভুলিয়ে দিতে পারে, কিন্তু তা কখনোই সমাধান নয়। প্রতিনিয়ত অ্যালকোহল শরীরে ডিহাইড্রেশন ঘটায়, ভিটামিন ও মিনারেল কমায়, লিভারে চরম ক্ষতি করে।
একটানা মদ্যপান দেহকে অভ্যন্তরীণভাবে শুকিয়ে ফেলে। খাবার, পানি ছাড়া দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা অসম্ভব—তাই শরীর ভেঙে পড়া ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সন্তানের ভবিষ্যৎ: একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তা
এখন একেবারে একা হয়ে পড়েছে ওই ১৬ বছরের কিশোর। বাবার মৃত্যু তার কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে অসংখ্য দায়িত্ব আর ভয়াবহ মানসিক ক্ষত। সমাজ কীভাবে এই কিশোরের পাশে দাঁড়াবে? কে তাকে দেবে সঠিক গাইডলাইন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও স্পষ্ট নয়।
সমাজের শিক্ষা: একাকিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই
এই ঘটনা আমাদের শেখায়, পারিবারিক ভাঙন কেবল দুটি মানুষের গল্প নয়—এতে সন্তান, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব—সবাই জড়িত। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব না হলে অন্তত মানসিক সাপোর্ট সিস্টেম গড়ে তোলা উচিত।
ডিভোর্সের পর যদি তিনি সঠিক পরামর্শদাতার সাহায্য পেতেন, বা পরিবারের কেউ যদি কঠোরভাবে চিকিৎসা করানোর ব্যবস্থা করত—তাহলে হয়তো এমন মৃত্যু হতো না।
উপসংহার
একজন মানুষের একাকিত্ব, মানসিক যন্ত্রণা এবং নেশার কাছে আত্মসমর্পণ—সব মিলিয়ে এই ঘটনা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায় মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে। সম্পর্ক ভেঙে গেলে তা শুধু একটি দাম্পত্যের ইতি নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা একটি জীবন আরেকটি জীবনকেও শেষ করে দিতে পারে।
আমরা প্রত্যেকেই যদি পাশে দাঁড়াই, বুঝি—কারো ভেতরের যুদ্ধকে গুরুত্ব দেই—তাহলে হয়তো এই ধরনের মৃত্যুর মিছিল কিছুটা হলেও থামানো সম্ভব।


