ভারতের হায়দরাবাদের বাসিন্দা মণীশ ধামেজা এখন সারা দেশে পরিচিত এক বিশেষ কারণে—তিনি একাই ১ হাজার ৬৩৮টি ক্রেডিট কার্ডের মালিক। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, প্রতিটি কার্ডই তাঁর সক্রিয় (অ্যাকটিভ) অবস্থায় আছে। আরও অবাক করা বিষয় হলো, তিনি কোনও কার্ডের বিল কখনও বকেয়া রাখেননি। সময়মতো সবকিছু পরিশোধ করেন নিয়ম মেনে। তাই অনেকেই তাঁকে এখন “ক্রেডিট কার্ড সম্রাট” নামে ডাকেন।
ক্রেডিট কার্ডে বিশ্ব রেকর্ড
ক্রেডিট কার্ড নিয়ে অনেকেই ঝামেলায় পড়েন—বিল ভুলে যান, দেনায় জড়ান। কিন্তু মণীশ ঠিক উল্টো। তিনি এমন দক্ষভাবে কার্ডগুলো ব্যবহার করেন যে, সেই দক্ষতাই তাঁকে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে জায়গা এনে দিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ক্রেডিট কার্ডের মালিক হিসেবে তাঁর নাম এখন ইতিহাসের পাতায়।
কীভাবে শুরু হলো তাঁর এই যাত্রা
মণীশের ক্রেডিট কার্ডের গল্প শুরু হয় একেবারে সাধারণভাবে। প্রথমে কয়েকটি কার্ড নিয়েছিলেন দৈনন্দিন কেনাকাটা ও ট্রাভেল সুবিধার জন্য। পরে ধীরে ধীরে আরও নতুন অফার, ব্যাংকের ভিন্ন ভিন্ন স্কিম, আর রিওয়ার্ড পয়েন্টের আকর্ষণ তাঁকে আরও অনেক কার্ড নিতে উৎসাহিত করে। একসময় তাঁর হাতে কার্ডের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায়, আর তিনি বুঝতে পারেন—এগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করলে কেবল খরচ নয়, বরং উপার্জনেরও পথ খুলে যায়।
কীভাবে ক্রেডিট কার্ডে রোজগার করেন মণীশ
অনেকেই মনে করেন, ক্রেডিট কার্ড মানে শুধু ঋণ নেওয়া বা খরচ বাড়ানো। কিন্তু মণীশের ধারণা পুরো উল্টো। তিনি ক্রেডিট কার্ডের রিওয়ার্ড পয়েন্ট, ক্যাশব্যাক অফার, ট্রাভেল বেনিফিট আর হোটেল বুকিং সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে নিয়মিত উপার্জন করেন। তাঁর কার্ডগুলোর মাধ্যমে পাওয়া বোনাস পয়েন্ট, কমপ্লিমেন্টারি ফ্লাইট টিকিট, ফ্রি হোটেল স্টে, এমনকি সিনেমার টিকিটও তিনি ব্যবহার করেন।
এভাবে তিনি ক্রেডিট কার্ডকে খরচের মাধ্যম না ভেবে একধরনের ‘ফাইন্যান্সিয়াল টুল’ হিসেবে কাজে লাগান। যেমন, কেউ একটা কার্ড দিয়ে কেনাকাটা করলে পয়েন্ট জমে, আর মণীশ সেই পয়েন্টগুলো ব্যবহার করেন ফ্লাইট বুকিং বা গিফট ভাউচারে। এতে তাঁর খরচ কমে যায়, আর সুবিধা বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
১৬৩৮টি কার্ডের হিসাব কীভাবে রাখেন তিনি
এতগুলো কার্ডের ব্যবহার আর বিল পরিশোধের হিসাব রাখা সহজ নয়। কিন্তু মণীশ বলেন, “আমার প্রতিটি কার্ডের বিলিং ডেট, লিমিট, ও অফার আমি আলাদা তালিকায় লিখে রাখি। সব তথ্য মোবাইল অ্যাপে সংরক্ষণ করি। ফলে কখনোই কোনও বিল মিস হয় না।”
তিনি প্রতিটি ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কও বজায় রাখেন নিয়মিত। ব্যাংকগুলোও তাঁকে সম্মান জানায় এমন নিয়মিত গ্রাহক হিসেবে, যিনি কখনও কোনও বকেয়া রাখেননি।
নোটবন্দির সময়ও হয়নি সমস্যা
২০১৬ সালের নোটবন্দির সময়, যখন সারা দেশ জুড়ে নগদ টাকার অভাব দেখা দিয়েছিল, তখনও মণীশের জীবন থেমে যায়নি। তিনি জানালেন, “আমার জন্য কোনও অসুবিধা হয়নি। কারণ আমি তখনও সবকিছু ক্রেডিট কার্ড দিয়েই করতাম—খাবার, কেনাকাটা, ভ্রমণ—সব।”
এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও নিশ্চিত করে তোলে যে ভবিষ্যতের লেনদেন হবে সম্পূর্ণ ডিজিটাল।
ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে তাঁর পরামর্শ
মণীশ বলেন, ক্রেডিট কার্ডকে ভয় পাওয়া বা দূরে রাখা নয়, বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করা শেখা জরুরি। তিনি কিছু সহজ নিয়ম মেনে চলেন—
১. বিল সবসময় সময়মতো পরিশোধ করতে হবে।
২. কার্ডের লিমিট অকারণে পূর্ণ করা উচিত নয়।
৩. ব্যাংকের অফারগুলো সম্পর্কে জানতে হবে এবং প্রয়োজনমতো ব্যবহার করতে হবে।
৪. একাধিক কার্ড থাকলে ট্র্যাক রাখতে হবে কোনটা কোথায় ব্যবহার হচ্ছে।
এই নিয়মগুলো মানলে ক্রেডিট কার্ড কখনোই বোঝা নয়, বরং একধরনের বুদ্ধিমানের পছন্দ হতে পারে—বললেন ক্রেডিট কার্ড সম্রাট নিজেই।
ক্রেডিট কার্ডের রাজা মণীশ ধামেজা
বর্তমানে মণীশ ধামেজা শুধু ভারতে নয়, গোটা বিশ্বে এক অনন্য উদাহরণ। তাঁর মতো মানুষ দেখিয়ে দিয়েছেন—টাকার সঠিক ব্যবহার মানেই বুদ্ধিমত্তা, আর প্রযুক্তিকে ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলেই জীবন আরও সহজ হয়ে যায়।
১ হাজার ৬৩৮টি কার্ডের প্রতিটিই যেন তাঁর সাফল্যের প্রতীক। আর তাঁর গল্প মনে করিয়ে দেয়, শৃঙ্খলা আর জ্ঞানের মিশ্রণই মানুষকে অনন্য করে তোলে।


