কুমির — এক রহস্যময় ও প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী, যার জীবনচক্র নিয়ে মানুষের আগ্রহের অন্ত নেই। বহুদিন ধরে এই ধারণা প্রচলিত যে কুমির বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যায় না, বরং তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে বড় হতে থাকে। তবে, এই সত্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক বিস্ময়কর জৈবিক এবং পরিবেশগত প্রক্রিয়া, যা তাদের দীর্ঘ জীবনযাপনকে সম্ভব করে তোলে।
অন্যান্য প্রাণীদের মতো কুমিরও জন্ম, বিকাশ এবং মৃত্যু — এই তিনটি ধাপে জীবনের চক্র সম্পন্ন করে। কিন্তু কুমিরের বার্ধক্য প্রক্রিয়াটি এতটাই ধীর যে এটি অনেক সময় অদৃশ্য মনে হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কুমিরের কোষে বার্ধক্যের নির্দিষ্ট লক্ষণ যেমন কোষ বিভাজনের গতি কমে যাওয়া বা টেলোমিয়ার ছোট হওয়া অনেক ধীর গতিতে ঘটে।
কুমিরকে ঘিরে এক আলোচিত জৈবিক ধারণা হলো নন-সেনেসেন্স। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে বয়স বাড়লেও শরীরিক বা প্রজনন ক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটে না। কুমিরের মধ্যে এই গুণটি বিদ্যমান, যা তাদের জীবনের প্রতিটি স্তরেই কার্যক্ষম রাখে। যদিও এটি অমরত্ব নয়, এটি দীর্ঘায়ুর একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
একটি প্রাপ্তবয়স্ক কুমির যদি একটি বড় শিকার খেতে পারে, তবে সে মাসের পর মাস এমনকি তিন বছর পর্যন্ত না খেয়েও বেঁচে থাকতে পারে। এটি সম্ভব হয় তাদের বিপাকীয় হার অত্যন্ত কম হওয়ায়। তারা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি শক্তি খরচ করে না এবং কোষের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস পায়।
খাদ্য গ্রহণের পর কুমির তাদের দেহে ফ্যাট এবং শক্তি সঞ্চয় করে রাখে, যা পরবর্তীতে ব্যবহৃত হয়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা অনিয়মিত খাদ্যপ্রাপ্তির মধ্যেও বেঁচে থাকতে সক্ষম হয়, যা প্রাকৃতিক পরিবেশে টিকে থাকার জন্য এক বিরল ক্ষমতা।
কুমির জল ও স্থল উভয় পরিবেশে অভিযোজিত হওয়ায় তারা নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারে। পানির নিচে ঘন্টার পর ঘন্টা নিঃশ্বাস না নিয়ে থাকতে পারে এবং স্থলভাগে সূর্যের আলোয় নিজেদের গরম করে রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে পারে।
অধিকাংশ প্রাণী যেখানে অক্সিজেনের স্বল্পতায় দুর্বল হয়ে পড়ে, সেখানে কুমির কম অক্সিজেনেও তাদের শারীরিক প্রক্রিয়া স্থগিত রেখে নিজেকে সংরক্ষণ করতে পারে। এটি তাদের দীর্ঘজীবন ও কঠিন অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতার প্রধান চাবিকাঠি।
রাশিয়ার এক চিড়িয়াখানায় একটি পুরুষ কুমির প্রায় ১১৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকার রেকর্ড গড়েছে। এ ছাড়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকার বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় কুমির ১০০ বছরের কাছাকাছি জীবিত থাকার দৃষ্টান্ত রয়েছে। সঠিক পরিচর্যা ও নিয়মিত খাদ্য সরবরাহের ফলে তারা সহজেই এক শতাব্দী অতিক্রম করতে পারে।
যেখানে প্রাকৃতিক পরিবেশে খাদ্যসংকট, শিকারী ও প্রতিকূল জলবায়ু কুমিরের জীবনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে মানবনির্মিত পরিবেশে এই সমস্যা অনেকাংশে থাকে না। ফলে বন্দি কুমিরের গড় আয়ু প্রাকৃতিক কুমিরের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে থাকে।
যদিও বার্ধক্যজনিত কারণে কুমির সাধারণত মারা যায় না, তথাপি রোগব্যাধি, সংক্রমণ ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গের বিকলতা তাদের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। বিশেষ করে ভাইরাস সংক্রমণ বা পরজীবী আক্রমণের ফলে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে।
বহু সময় দেখা যায়, দীর্ঘ সময় ধরে খাদ্যের অভাবে কুমির ক্ষুধার্ত অবস্থায় শরীরের শক্তি হারিয়ে ফেলে, ফলে তারা বাঁচতে পারে না। শুষ্ক মৌসুম বা শিকারের অভাবে এটি ঘটে থাকে।
অনেক সময় কুমির মানব শিকার, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা শত্রুর আক্রমণে মারা যায়। জেলেদের জালে আটকে পড়া, নদীতে পানির স্তর হঠাৎ কমে যাওয়া, বা বাসস্থানের ধ্বংস — এসবই তাদের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
এখান থেকেই স্পষ্ট হয়, কুমির অমর নয়। তবে অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় তাদের জীবনকাল অসাধারণভাবে দীর্ঘ। বার্ধক্যজনিত মৃত্যু না হওয়া এবং খাদ্যাভাবে টিকে থাকার ক্ষমতা এই দীর্ঘায়ুর পেছনে মূল চালিকা শক্তি। এর সাথে যুক্ত হয় অভিযোজন ক্ষমতা ও শারীরিক সহনশীলতা।
কুমিরের কোষীয় গঠন ও বৃদ্ধির প্রক্রিয়ার উপরে গবেষণা মানব বার্ধক্য কমানোর উপায় খুঁজে বের করতে সহায়ক হতে পারে। বিজ্ঞানীরা কুমিরের ডিএনএ ও টিস্যুর রিজেনারেটিভ ক্ষমতা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
কুমিরের শরীরে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধী জিন পাওয়া গেছে, যেগুলি ক্যান্সার প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখতে পারে। ভবিষ্যতে এই জিনগুলো ব্যবহার করে ঔষধ উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কুমির অমর নয়, তবে তার জীবনীশক্তি ও অভিযোজন ক্ষমতা তাকে প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টিতে পরিণত করেছে। খাদ্যের অভাবেও টিকে থাকা, বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা না থাকা, এবং কঠিন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়া — সব মিলিয়ে কুমির একটি জীবন্ত জীবাশ্ম, যার জীবনচক্র আমাদের অজানা অনেক প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রাখে।


