রহস্যে ঘেরা লাল জলের ন্যাট্রন হ্রদ: ছোঁয়া লাগলেই কি সত্যিই পাথর হয়ে যায় পাখি?

পৃথিবী এমন সব বিস্ময়ে ভরা, যা শুনলে প্রথমে গল্প মনে হয়। তেমনই এক জায়গা হলো পূর্ব আফ্রিকার তানজানিয়ার বিখ্যাত ন্যাট্রন হ্রদ। এখানে লাল রঙের জলের মধ্যে দেখা যায় অদ্ভুত এক দৃশ্য—মরা পাখির দেহ পাথরের মতো শক্ত হয়ে পড়ে থাকে। অনেকেই বলেন, এই হ্রদের জল ছুঁলেই নাকি পাখি পাথর হয়ে যায়!

শুনতে ভয়ংকর লাগলেও, এর পেছনে রয়েছে বিজ্ঞান আর প্রকৃতির অদ্ভুত খেলা। চলুন সহজ করে পুরো বিষয়টা বুঝে নেওয়া যাক।

ন্যাট্রন হ্রদ কোথায় এবং কেন এত আলোচিত?

পূর্ব আফ্রিকার দেশ তানজানিয়া–র উত্তরের নির্জন অঞ্চলে অবস্থিত এই হ্রদ। চারদিকে ছোট পাহাড় আর শুকনো প্রান্তর। আশপাশে মানুষের বসতি প্রায় নেই বললেই চলে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় কেউ যেন লাল রং ঢেলে দিয়েছে জলের ওপর।

এই লালচে জলের কারণেই ন্যাট্রন হ্রদ বহু বছর ধরে বিজ্ঞানী, পর্যটক আর ফটোগ্রাফারদের কৌতূহলের কেন্দ্র।

কেন লাল দেখায় ন্যাট্রন হ্রদের জল?

প্রথম দেখায় মনে হয় জলে রক্ত মিশে আছে। কিন্তু আসল কারণটা ভিন্ন।

হ্রদের জলে থাকে বিশেষ ধরনের অণুজীব—মূলত হ্যালোফিলিক শৈবাল ও ব্যাকটেরিয়া। এরা অত্যন্ত ক্ষারীয় পরিবেশে বেঁচে থাকে এবং লালচে রঞ্জক তৈরি করে। সেই রঞ্জক জলের ওপর ছড়িয়ে পড়ে, ফলে পুরো হ্রদ লাল বা কমলা রঙের দেখায়।

গরমের সময় পানি বেশি শুকিয়ে গেলে এই রং আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। তখন দৃশ্যটা সত্যিই অবাক করার মতো লাগে।

সত্যিই কি পাখি পাথর হয়ে যায়?

এটাই সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই দাবি করা হয়—হ্রদের জল ছুঁলেই পাখি মুহূর্তে পাথর হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবটা একটু আলাদা।

ন্যাট্রন হ্রদের পানি অত্যন্ত ক্ষারীয় (alkaline)। এতে প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম কার্বোনেট ও ক্যালসিয়াম বাইকার্বোনেট মিশে থাকে। এই রাসায়নিকগুলো মৃত প্রাণীর দেহ দ্রুত শুকিয়ে শক্ত করে ফেলে। অনেকটা প্রাকৃতিক মমির মতো।

মানে কী দাঁড়াল?

পাখি সঙ্গে সঙ্গে পাথর হয়ে যায় না। বরং—

কোনো পাখি যদি হ্রদের তীব্র ক্ষারীয় পানিতে মারা যায়

তারপর তার দেহ পানিতে পড়ে থাকে

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেহ শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায়

ফলে দেখতে ঠিক পাথরের মূর্তির মতো লাগে।

কেন এত ক্ষারীয় এই হ্রদের পানি?

এই হ্রদের আশপাশের পাহাড় থেকে বিভিন্ন খনিজ ও লবণ ধুয়ে এসে জলে মেশে। পাশাপাশি কাছাকাছি আগ্নেয়গিরি অঞ্চল থেকেও খনিজ পদার্থ আসে। আরও আছে উষ্ণ প্রস্রবণ, যা নিয়মিত এই হ্রদে পানি যোগ করে।

সব মিলিয়ে এখানে—

লবণের মাত্রা খুব বেশি

পানির pH অত্যন্ত উচ্চ

তাপমাত্রাও অনেক সময় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়

এই কঠিন পরিবেশে বেশিরভাগ প্রাণী টিকতেই পারে না।

তবুও কি কোনো প্রাণী এখানে বেঁচে থাকে?

মজার বিষয় হলো—যেখানে বেশিরভাগ প্রাণী বাঁচতে পারে না, সেখানে কিছু প্রাণী দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে।

বিশেষ করে লেসার ফ্লেমিংগো পাখির বড় উপনিবেশ এই হ্রদের আশপাশে বাসা বাঁধে। কারণ—

এখানে তাদের শত্রু কম

লাল শৈবাল তাদের খাবার

অতি ক্ষারীয় পানি অনেক শিকারিকে দূরে রাখে

তাই ন্যাট্রন হ্রদ যেমন ভয়ংকর, তেমনই কিছু প্রাণীর জন্য নিরাপদ আশ্রয়ও।

রহস্য সামনে আনলেন যে ফটোগ্রাফার

এই হ্রদের “পাথর পাখি” দৃশ্য বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে একজন ফটোগ্রাফারের ছবির মাধ্যমে। ব্রিটিশ ফটোগ্রাফার নিক ব্রান্ট এখানে এসে শক্ত হয়ে যাওয়া পাখির দেহের ছবি তোলেন।

তার তোলা ছবিগুলো এতটাই অবাক করা ছিল যে, অনেকেই প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি। এরপর থেকেই ন্যাট্রন হ্রদ বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়ে যায়।

কত পুরনো এই রহস্যময় হ্রদ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ন্যাট্রন হ্রদের সৃষ্টি খুব প্রাচীন নয়। ধারণা করা হয়, প্রায় ১৫ লক্ষ বছর আগে ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলে এই হ্রদের জন্ম।

ভূমির ফাটল, আগ্নেয় কার্যকলাপ আর খনিজ জমার মিলিত প্রভাবে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে এই অদ্ভুত পরিবেশ।

পর্যটকদের জন্য সতর্কতা

দেখতে যতই সুন্দর লাগুক, এই হ্রদের পানিতে নামা মোটেও নিরাপদ নয়। কারণ—

পানির ক্ষারীয় মাত্রা ত্বকে জ্বালা করতে পারে

লবণের ঘনত্ব খুব বেশি

তাপমাত্রাও অনেক সময় বিপজ্জনক

তাই দূর থেকে দেখাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

শেষ কথা: রহস্য না বিজ্ঞান?

ন্যাট্রন হ্রদকে ঘিরে অনেক গল্প ছড়ালেও, আসলে এটি প্রকৃতির এক চমৎকার রাসায়নিক খেলা। পাখি হঠাৎ পাথর হয়ে যায়—এটা পুরোপুরি সত্য নয়। কিন্তু হ্রদের তীব্র ক্ষারীয় পরিবেশ মৃত প্রাণীর দেহকে এমনভাবে সংরক্ষণ করে যে, দেখতে সত্যিই পাথরের মূর্তি মনে হয়।

প্রকৃতি মাঝে মাঝে এমন দৃশ্য তৈরি করে, যা আমাদের চোখকে ধোঁকা দেয়। ন্যাট্রন হ্রদ ঠিক তেমনই এক বিস্ময়—ভয়ংকর, সুন্দর এবং রহস্যে মোড়া।

লেটেস্ট আপডেট

বিশ্বকাপে চমক! ফখর–ফারহানের ব্যাটে ২১২, নেটিজেনদের তোলপাড়

পাকিস্তানের ক্রিকেট মানেই অনিশ্চয়তা, উত্তেজনা আর হঠাৎ জ্বলে ওঠার...

রোনাল্ডোর পর এবার মেসি! ট্রাম্পের সঙ্গে কবে দেখা করবেন আর্জেন্টাইন সুপারস্টার?

বিশ্ব ফুটবল মানেই শুধু মাঠের লড়াই নয়। কখনও কখনও...

যশোরের হৃদয়ে আজও বেঁচে আছে মধু সুইটসের স্বাদ ও আড্ডা

যশোর শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে...

নুরুজ্জামান লাল্টুর জীবনকাহিনী: মুক্তিযোদ্ধা থেকে চরমপন্থী, তারপর আত্মসমর্পণ!

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহুল আলোচিত ব্যক্তিত্ব, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গা গ্রামের সন্তান...

যশোরে ভয়াবহ আগুন! রোমান জুট মিলে কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি

যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া শিল্প শহরের উড়োতলা এলাকায় অবস্থিত...

বাছাই সংবাদ

নুরুজ্জামান লাল্টুর জীবনকাহিনী: মুক্তিযোদ্ধা থেকে চরমপন্থী, তারপর আত্মসমর্পণ!

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহুল আলোচিত ব্যক্তিত্ব, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গা গ্রামের সন্তান...

যশোরে ভয়াবহ আগুন! রোমান জুট মিলে কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি

যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া শিল্প শহরের উড়োতলা এলাকায় অবস্থিত...

মাদক ও সন্ত্রাস বন্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি—যশোরে বড় বক্তব্য বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর

সন্ত্রাসী ও মাদকের ক্ষেত্রে রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা বিএনপি শতভাগ বন্ধ...

এলসি খুলে দেয়ার টোপে সর্বনাশ: ফারজানা ইয়াসমিন নিলার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ

ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা আমদানির জন্য এলসি (লেটার অব ক্রেডিট)...

নির্বাচনে আমাকে কেউ জিজ্ঞেসই করেনি! কেন ক্ষুব্ধ সাখাওয়াত হোসেন?

বাংলাদেশের সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা...

বিশ্বজুড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে রাস্তা: বাঙালির গর্বের এক অনন্য ইতিহাস

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—এই নামটি শুনলেই বাঙালির মনে এক ধরনের আবেগ...

ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সুখবর: ঈদুল ফিতরের আগে ভাতা চালুর উদ্যোগ

ঈদুল ফিতরের আগেই দেশের সকল মসজিদের খতিব, ইমামদেরকে পর্যায়ক্রমে...

যশোরের বাগদাহ গ্রাম কেন আজ ভয় আর লজ্জার নাম? মেয়েদের বিয়ে থমকে যাচ্ছে!

যশোরের অভয়নগর উপজেলার বাগদাহ গ্রামে মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের কারণে...

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

জনপ্রিয় ক্যাটাগরি