ভাবতে পারো, কেউ একটি লোহার তৈরি বিশাল টাওয়ারকে নিজের স্বামী বলে মেনে নিয়েছে? শুনলে অবিশ্বাস্য লাগে। কিন্তু এই ঘটনাই একসময় সারা পৃথিবীকে চমকে দিয়েছিল। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস–এর হৃদয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিখ্যাত আইফেল টাওয়ার শুধু পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রই নয়, এক নারীর কাছে ছিল তার জীবনের সঙ্গী।
এই গল্পটা সাধারণ প্রেমকাহিনি নয়। এখানে ভালোবাসার মানুষ নেই, আছে ইস্পাতের তৈরি এক স্থাপনা। তবুও সেই ভালোবাসা ছিল গভীর, ব্যক্তিগত এবং একেবারে বাস্তব—অন্তত সেই নারীর কাছে।
প্যারিস মানেই প্রেমের শহর। আর সেই শহরের প্রতীক হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আইফেল টাওয়ার। ১৮৮৯ সালে নির্মিত এই ধাতব স্থাপনা আজ বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখানে আসে ছবি তুলতে, ঘুরতে, ভালোবাসার মুহূর্ত ধরে রাখতে।
কিন্তু কল্পনা করো, কেউ যদি এই টাওয়ারটাকেই নিজের জীবনের সঙ্গী বানাতে চায়? শুধু ভালো লাগা নয়, একেবারে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়? এমনই করেছিলেন এক মার্কিন নারী—ইরিকা।
ইরিকার পুরো নাম Erika Eiffel। ২০০৭ সালে তিনি ঘোষণা দেন যে তিনি আইফেল টাওয়ারকে ভালোবাসেন এবং সেটিকেই বিয়ে করতে চান। প্রথমে অনেকেই বিষয়টাকে মজা ভেবেছিল। কেউ বলেছিল এটা নিছক প্রচারের চেষ্টা। কিন্তু ইরিকা ছিলেন একেবারে সিরিয়াস।
তিনি বিশ্বাস করতেন, তার অনুভূতি সত্যি। তার কাছে আইফেল টাওয়ার শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং এক সঙ্গী—যার সঙ্গে তিনি মানসিক বন্ধন অনুভব করেন।
শুনতে অদ্ভুত লাগতেই পারে। কিন্তু ইরিকার কাছে এটা ছিল হৃদয়ের ব্যাপার।
ইরিকা শুধু ভালোবাসার কথা বলেই থেমে থাকেননি। তিনি প্রতীকীভাবে আইফেল টাওয়ারকে বিয়ে করেন। অনুষ্ঠানও হয়েছিল নিয়ম মেনে। উপস্থিত ছিলেন কিছু বন্ধু ও সমর্থক। বিয়ের পর তিনি নিজের নামের শেষে ‘আইফেল’ যোগ করেন। তখন থেকে তিনি নিজেকে ইরিকা আইফেল হিসেবেই পরিচয় দিতেন।
এটা কেবল নাটকীয় কিছু ছিল না। তিনি প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন যে আইফেল টাওয়ার তার স্বামী। তার কথায়, এই সম্পর্ক তাকে মানসিকভাবে পরিপূর্ণতা দিয়েছে।
ভাবো তো, আমরা কেউ হয়তো কোনো প্রিয় জায়গা বা জিনিসের প্রতি টান অনুভব করি। যেমন কারও শৈশবের বাড়ি, কারও প্রিয় বই, বা কারও প্রিয় গাড়ি। কিন্তু সেই টানকে যদি কেউ বিয়ের পর্যায়ে নিয়ে যায়—তাহলে সেটাই হয়ে যায় ইরিকার গল্প।
ইরিকা নিজেকে “অবজেক্টাম সেক্সুয়াল” হিসেবে পরিচয় দেন। অর্থাৎ, তিনি মানুষ নয়, বরং নির্জীব বস্তুর প্রতি প্রেম ও আকর্ষণ অনুভব করেন। এই ধারণা খুব বিরল। পৃথিবীতে এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এই ধরনের আকর্ষণ ব্যক্তির গভীর আবেগ, সংযুক্তি ও মানসিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত। অনেক সময় এটি ব্যক্তির নিজস্ব নিরাপত্তাবোধ বা আবেগগত স্থিরতার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
ইরিকার দাবি ছিল, আইফেল টাওয়ারের শক্তি, গঠন আর স্থিরতা তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। তিনি টাওয়ারটির উপস্থিতিতে এক ধরনের শান্তি অনুভব করতেন।
ইরিকা প্রায় ১০ বছর ধরে আইফেল টাওয়ারকে নিজের স্বামী হিসেবে মেনে চলেছেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি বারবার প্যারিসে গিয়েছেন। টাওয়ারের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। তার ভাষায়, তিনি তার “স্বামীর” সঙ্গে আবেগগতভাবে জড়িয়ে ছিলেন।
এই সম্পর্ক তার জীবনের বড় অংশ জুড়ে ছিল। তিনি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, টাওয়ারের কাছে দাঁড়ালে তিনি এক ধরনের ভালোবাসা ও সংযোগ অনুভব করতেন—যেমনটা অনেকে তাদের সঙ্গীর কাছে অনুভব করেন।
শুনতে কল্পনার মতো লাগলেও, তার অনুভূতি ছিল বাস্তব।
প্রায় এক দশক পর এই সম্পর্কের ইতি ঘটে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ইরিকা নাকি অন্য কিছুর প্রেমে পড়েছেন। তবে সেটিও কোনো মানুষ নয়। অর্থাৎ, তার ভালোবাসার ধরন বদলায়নি, শুধু ভালোবাসার “অবজেক্ট” বদলেছে।
এখানেই এই গল্পটা আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে। কারণ সাধারণ সম্পর্কের মতোই এখানে ভালোবাসা এসেছে, থেকেছে, আবার শেষও হয়েছে।
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। কেউ এটাকে অদ্ভুত বলে সমালোচনা করেছেন। কেউ আবার বলেছেন, ব্যক্তিগত অনুভূতির স্বাধীনতাকে সম্মান করা উচিত।
সোশ্যাল মিডিয়া আর সংবাদমাধ্যমে এই গল্প ভাইরাল হয়ে যায়। অনেকে মজা করেছেন, অনেকে সিরিয়াস আলোচনা করেছেন। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার—এই ঘটনা মানুষকে ভাবতে বাধ্য করেছে, ভালোবাসা আসলে কী?
আমরা সাধারণত ভাবি ভালোবাসা মানেই দুইজন মানুষ। কিন্তু ইরিকার ঘটনা দেখায়, মানুষের অনুভূতির জগৎ অনেক বেশি জটিল ও বৈচিত্র্যময়।
আইফেল টাওয়ার বরাবরই প্রেমের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। অসংখ্য প্রেমিক-প্রেমিকা এখানে প্রপোজ করেছেন, বিয়ের ছবি তুলেছেন। কিন্তু এই প্রথম কোনো ব্যক্তি নিজেই টাওয়ারটিকে বিয়ে করেছেন বলে দাবি করেন।
এতে টাওয়ারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কমেনি। বরং এক নতুন অধ্যায় যোগ হয়েছে তার গল্পে। এখন যখন কেউ এই স্থাপনার কথা বলে, অনেকেই ইরিকার সেই অদ্ভুত বিয়ের কথাও মনে করে।
এই গল্প আমাদের একটা বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—ভালোবাসার সংজ্ঞা কি একটাই? নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বদলায়?
আমরা অনেক সময় এমন কিছু শুনলে অবাক হই, কারণ সেটা আমাদের চেনা বাস্তবের বাইরে। কিন্তু পৃথিবীজুড়ে নানা ধরনের মানুষ, নানা ধরনের অনুভূতি আছে। সবকিছু আমাদের কাছে স্বাভাবিক না লাগলেও, কারও কাছে সেটা হতে পারে জীবনের সবচেয়ে সত্যি অনুভূতি।
ইরিকার গল্প হয়তো সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু এটা নিঃসন্দেহে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এটি দেখায়, মানুষের আবেগ কতটা গভীর ও অদ্ভুত হতে পারে।
শেষমেশ বলা যায়, প্যারিসের আকাশ ছোঁয়া আইফেল টাওয়ার শুধু ইস্পাত আর রিভেটের তৈরি এক স্থাপনা নয়। কারও কাছে এটি ছিল ভালোবাসার প্রতীক, আবার কারও কাছে জীবনের সঙ্গী। আর এই অদ্ভুত দাম্পত্যের গল্প আজও মানুষের কৌতূহল জাগিয়ে রাখে।



