প্রকৃতির বিস্ময়কর দুনিয়ায় পাখি মানেই রঙ, সুর আর উড়ে বেড়ানোর স্বাধীনতা। মানুষ ছোটবেলা থেকেই পাখি দেখতে ভালোবাসে। অনেকেই সুযোগ পেলে পাখিকে হাতে নিতেও চান, ছুঁয়ে দেখতে চান তাদের নরম পালক। কিন্তু ভাবুন তো—যদি এমন কোনো পাখি থাকে, যাকে ছুঁলেই বিপদ! অবিশ্বাস্য শোনালেও বাস্তবে এমনই এক পাখি আছে। তার নাম হুডেড পিটোহুই—দেখতে যত সুন্দর, স্পর্শে ততটাই বিপজ্জনক।
হুডেড পিটোহুই (Hooded Pitohui) দেখতে সত্যিই মনমুগ্ধকর। কালো আর উজ্জ্বল কমলা রঙের মিশ্রণে এদের গায়ের সাজ যেন আঁকা ছবি। দূর থেকে দেখলে যে কেউ মুগ্ধ হয়ে যাবে। স্বাভাবিকভাবেই এমন সুন্দর পাখিকে কাছে থেকে দেখতে বা ছুঁতে ইচ্ছা জাগতেই পারে।
কিন্তু এখানেই রয়েছে বড় চমক। এই পাখিকে ছোঁয়া মোটেও নিরাপদ নয়। কারণ এটি পৃথিবীর অন্যতম বিষাক্ত পাখি হিসেবে পরিচিত। তাই প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এটি যেমন আকর্ষণের, তেমনি সতর্কতারও বিষয়।
এই অদ্ভুত পাখির বাস মূলত নিউ গিনির ঘন জঙ্গলে। স্থানীয় মানুষ বহুদিন ধরেই এই পাখিকে চেনে এবং এড়িয়ে চলে। তারা একে প্রায়ই “রাবিশ বার্ড” বা “জঞ্জাল পাখি” বলে ডাকে। নামটা একটু কড়া শোনালেও এর পেছনে আছে বাস্তব অভিজ্ঞতা।
কারণ তারা জানে—এই পাখিকে স্পর্শ করলে শরীরে অস্বস্তিকর প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তাই সৌন্দর্য থাকা সত্ত্বেও স্থানীয়দের কাছে এটি মোটেও প্রিয় নয়।
হুডেড পিটোহুইয়ের শরীর ও পালকে থাকে এক ধরনের শক্তিশালী বিষ, যার নাম ব্যাট্রাকোটক্সিন (Batrachotoxin)। এই একই ধরনের বিষ কিছু মারাত্মক ব্যাঙের শরীরেও পাওয়া যায়। পাখিটির গায়ে হাত পড়লে এই বিষ মানুষের ত্বকের মাধ্যমে প্রভাব ফেলতে পারে।
যারা অসাবধানতাবশত এই পাখিকে ধরেছে, তারা সাধারণত যেসব সমস্যার কথা বলে—
শরীর ঝিনঝিন করা
হালকা অবশ ভাব
স্নায়ুতে অস্বস্তি
কখনও সাময়িক প্যারালিসিসের মতো অনুভূতি
তবে সাধারণ স্পর্শে প্রাণঘাতী না হলেও, এটি মোটেই নিরাপদ নয়। বিশেষ করে সংবেদনশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া বেশি হতে পারে।
প্রকৃতি সব প্রাণীকেই বাঁচার জন্য কিছু না কিছু কৌশল দিয়েছে। হুডেড পিটোহুইয়ের ক্ষেত্রে সেই কৌশল হলো তার বিষাক্ত শরীর। শিকারি প্রাণীরা সাধারণত এই পাখিকে এড়িয়ে চলে, কারণ একবার অভিজ্ঞতা হলেই তারা বুঝে যায়—এই পাখি সহজ শিকার নয়।
মজার ব্যাপার হলো, এই পাখি জন্মগতভাবে বিষাক্ত নয়। অর্থাৎ বাচ্চা অবস্থায় তাদের শরীরে বিষ থাকে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, হুডেড পিটোহুই মূলত এক ধরনের বিষাক্ত গুবরে পোকা খায় (বিশেষ করে Choresine গণের পোকা)। এই পোকাগুলোর শরীরে থাকা বিষ ধীরে ধীরে পাখির শরীরে জমা হয়। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাখিটিও বিষাক্ত হয়ে ওঠে।
এটা অনেকটা যেমন—আপনি যদি প্রতিদিন ঝাল মরিচ খান, ধীরে ধীরে ঝালের সহ্যক্ষমতা বাড়ে। ঠিক তেমনই, এই পাখি খাবারের মাধ্যমেই নিজের শরীরে প্রতিরক্ষামূলক বিষ জমায়।
সব সতর্কতা সত্ত্বেও হুডেড পিটোহুই মানুষের কৌতূহল কমায়নি। বরং “পৃথিবীর বিষাক্ত পাখি” তকমা পাওয়ার পর থেকে এটি নিয়ে গবেষণা ও আগ্রহ আরও বেড়েছে। পাখিপ্রেমী, গবেষক এবং বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রীদের কাছে এটি এক বিশেষ আকর্ষণের নাম।
কারণ প্রকৃতিতে এমন উদাহরণ খুবই বিরল, যেখানে একটি পাখি নিজেকে রক্ষা করতে বিষ ব্যবহার করে।
হুডেড পিটোহুই নিয়ে কিছু চমকপ্রদ তথ্য
এই পাখিকে ঘিরে কয়েকটি তথ্য সত্যিই অবাক করার মতো—
এটি বিশ্বের প্রথম স্বীকৃত বিষাক্ত পাখিগুলোর একটি
এর উজ্জ্বল রং আসলে সতর্কবার্তা (warning coloration) হিসেবে কাজ করে
শিকারিরা একবার অভিজ্ঞতা পেলেই সাধারণত আর কাছে আসে না
সব পিটোহুই সমান বিষাক্ত নয়; খাদ্যাভ্যাসের ওপর বিষের মাত্রা নির্ভর করে
হুডেড পিটোহুই আমাদের একটা বড় শিক্ষা দেয়। আমরা প্রায়ই ভাবি সুন্দর মানেই নিরীহ। কিন্তু প্রকৃতি অনেক সময় উল্টো গল্প বলে। বাহ্যিক সৌন্দর্যের আড়ালেও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা লুকিয়ে থাকতে পারে।
তাই অজানা কোনো পাখি বা বন্যপ্রাণী দেখলে দূর থেকে উপভোগ করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। অকারণে ধরতে যাওয়া বা ছুঁতে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
কমলা-কালো রঙে মোড়া হুডেড পিটোহুই প্রকৃতির এক অসাধারণ বিস্ময়। দেখতে মায়াবী হলেও এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতিকে সম্মান করতে হয়, দূরত্ব বজায় রাখতে হয়। কৌতূহল ভালো, কিন্তু সতর্কতা তার চেয়েও জরুরি।
আপনি যদি কখনও নিউ গিনির জঙ্গলে এই সুন্দর পাখিটিকে দেখেন, দূর থেকেই উপভোগ করুন। কারণ এই সৌন্দর্য ছোঁয়ার জন্য নয়—শুধু দেখার জন্যই যথেষ্ট।



