জীবনে কিছু সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায় বলে আমরা ভাবি। স্কুলের বন্ধু, কলেজের সহপাঠী কিংবা বিদেশে থাকা কোনো প্রিয় মুখ—এক সময় যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলে মনে হয়, অধ্যায়টা বুঝি এখানেই শেষ। কিন্তু কখনও কখনও ভাগ্য অন্য গল্প লেখে। ঠিক তেমনই এক অবিশ্বাস্য ঘটনার সাক্ষী হলো বিশ্ব। একটি ভুলে যাওয়া ইমেল অ্যাড্রেস ৪৮ বছর পর মিলিয়ে দিল দুই পুরনো বন্ধুকে, যাঁরা ছিলেন পৃথিবীর দুই প্রান্তে।
একজন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলিনার বাসিন্দা ওয়াল্টার, অন্যজন জাপানের নাগরিক কাজুহিকো। দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতক ধরে যাঁদের কোনো যোগাযোগ ছিল না, তাঁদের আবার কাছে এনে দিল প্রযুক্তির এক ছোট্ট সূত্র—একটি পুরনো ইমেল ঠিকানা।
এই গল্পের শুরু অনেক বছর আগে। তখন তরুণ বয়স। বিশ্বকে জানার আগ্রহে কাজুহিকো জাপান থেকে আমেরিকায় পাড়ি দেন এক্সচেঞ্জ স্টুডেন্ট হিসেবে। সেই সময় তিনি থাকতেন ওয়াল্টারের পরিবারের সঙ্গে। একইভাবে ওয়াল্টার পরিবারের ছেলেটিও গিয়েছিলেন জাপানে পড়াশোনা করতে।
এই এক্সচেঞ্জ স্টুডেন্ট প্রোগ্রামের মূল ভাবনাই হলো, এক দেশের মানুষ অন্য দেশের সংস্কৃতি, ভাষা আর জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখবে। কিন্তু সেই সঙ্গে তৈরি হয় এমন কিছু সম্পর্ক, যা কাগজে লেখা নিয়মের চেয়েও গভীর। কাজুহিকো আর ওয়াল্টারের বন্ধুত্বও ছিল তেমনই। একসঙ্গে পড়াশোনা, গল্প, দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক আন্তরিক সম্পর্ক।
সময় থেমে থাকে না। পড়াশোনা শেষ হলে কাজুহিকো ফিরে যান জাপানে। তখন যোগাযোগ রাখার মাধ্যম খুব সীমিত ছিল। মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া তো দূরের কথা, ইন্টারনেটই ছিল বিলাসিতা। কাজুহিকো যাওয়ার সময় ওয়াল্টার পরিবারকে নিজের ইমেল অ্যাড্রেস দিয়েছিলেন, যাতে ভবিষ্যতে যোগাযোগ রাখা যায়।
কিন্তু জীবন যেমন হয়, ব্যস্ততা আর সময়ের স্রোতে সেই ইমেল ঠিকানাটি কোথাও হারিয়ে যায়। একসময় যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বছর পেরোয়, দশক পেরোয়, কিন্তু আর কোনো খবর থাকে না একে অন্যের।
প্রায় ৪৮ বছর পর ওয়াল্টারের জীবনে আসে এক নতুন পরিকল্পনা। তিনি আবার জাপান ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। টিকিট কাটার প্রস্তুতি নিতে নিতে হঠাৎ তাঁর মনে পড়ে যায় সেই পুরনো বন্ধুর কথা—কাজুহিকো। মনে প্রশ্ন জাগে, এত বছর পর কি তাঁকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব?
কিন্তু কীভাবে? নাম ছাড়া কোনো ঠিকানা নেই, ফোন নম্বর নেই, শুধু ছিল বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া একটি ইমেল অ্যাড্রেস। তবুও আশা ছাড়েননি ওয়াল্টার। তিনি খুঁজতে শুরু করেন সেই পুরনো সূত্র।
এই গল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ এখানেই। ওয়াল্টার তাঁর ঠাকুমার পুরনো জিনিসপত্র ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎ একটি কাগজে চোখে পড়েন সেই পরিচিত নাম—কাজুহিকো। সেখানেই লেখা ছিল বহু বছর আগের সেই ইমেল অ্যাড্রেস।
ভাবা যায়? যেটাকে সবাই হারিয়ে গেছে বলে ধরে নিয়েছিল, সেটাই লুকিয়ে ছিল স্মৃতির এক কোণে। ওয়াল্টার আর দেরি করেননি। জাপানে যাওয়ার আগেই তিনি সেই ইমেল ঠিকানায় একটি মেইল পাঠান। মনের ভেতরে একরাশ আশা, আবার একটু ভয়ও—এত বছর পর কি কেউ আর সেই ইমেল ব্যবহার করেন?
কিছুদিন পরই আসে সেই মুহূর্ত, যা ওয়াল্টার কোনোদিন ভুলবেন না। কাজুহিকোর কাছ থেকে উত্তর আসে। হ্যাঁ, তিনি এখনও সেই ইমেল অ্যাড্রেস ব্যবহার করেন। এত বছর পর পুরনো বন্ধুর নাম দেখে তিনিও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
এই একটি ইমেলই যেন সময়ের দেয়াল ভেঙে দেয়। দুই প্রান্তে থাকা দুই বন্ধু আবার ফিরে যান সেই পুরনো দিনে, যখন বয়স কম ছিল, চিন্তা কম ছিল, আর বন্ধুত্ব ছিল নিখাদ।
জাপানে পৌঁছানোর পর অবশেষে দেখা হয় ওয়াল্টার আর কাজুহিকোর। ৪৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটে একদিনেই। তাঁরা একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া করেন, গল্প করেন, পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করেন। সময় যেন আবার পিছিয়ে যায়।
চুল পেকে গেছে, জীবন বদলে গেছে, কিন্তু বন্ধুত্বের উষ্ণতা একটুও কমেনি। দু’জনই অনুভব করেন, কিছু সম্পর্ক সময়ের কাছে হার মানে না।
এই ঘটনাটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোড়ন ফেলেছে। কারণ এটি শুধু দুই বন্ধুর দেখা হওয়ার গল্প নয়। এটি স্মৃতি, আশা আর মানবিক সম্পর্কের গল্প। আজকের দিনে যখন আমরা ভাবি, একটি মেসেজের উত্তর না পেলে সম্পর্ক শেষ—সেখানে ৪৮ বছর পর একটি ইমেল আবার সব কিছু জোড়া লাগিয়ে দিল।
এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কখনও কখনও পুরনো ডায়েরি, পুরনো কাগজ বা ভুলে যাওয়া একটি ঠিকানার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর চমক।
ওয়াল্টার আর কাজুহিকোর গল্প প্রমাণ করে, দূরত্ব আর সময় সবসময় সম্পর্ক ভাঙতে পারে না। মাঝে মাঝে শুধু দরকার একটু চেষ্টা আর একটু আশা। একটি ভুলে যাওয়া ইমেল অ্যাড্রেস যেমন ৪৮ বছর পর দুই বন্ধুকে মিলিয়ে দিতে পারে, তেমনি আমাদের জীবনেও হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কগুলো হয়তো এখনো কোথাও অপেক্ষা করে আছে।
হয়তো আজই পুরনো কোনো ইনবক্স, ডায়েরি কিংবা স্মৃতির বাক্স খুলে দেখার সময়। কে জানে, সেখানেই লুকিয়ে আছে আরেকটি এমন গল্প।


