দাঁতে কালো ছোপ পড়লে সাধারণত মানুষ অস্বস্তিতে ভোগে। আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি—ঝকঝকে সাদা দাঁত মানেই সৌন্দর্য ও আত্মবিশ্বাস। টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনেও দেখানো হয়, মুক্তোর মতো সাদা দাঁত হাসিকে করে তোলে আকর্ষণীয়। কিন্তু পৃথিবীর এক কোণে এমন এক সংস্কৃতি রয়েছে, যেখানে ঠিক উল্টো ধারণা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। সেখানে সাদা নয়, বরং কালো দাঁতই সৌন্দর্যের মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়।
শুনতে অবাক লাগলেও, ভিয়েতনাম-এর কিছু অঞ্চলে আজও এই ঐতিহ্যের ছাপ দেখা যায়। বিশেষ করে অতীতে এটি ছিল সামাজিক মর্যাদা ও অভিজাত পরিচয়ের প্রতীক।
কেন কালো দাঁতকে সুন্দর মনে করা হত?
আমাদের কাছে যেটা অস্বাভাবিক, সেই ধারণাটাই একসময় ভিয়েতনামের সমাজে ছিল একেবারে স্বাভাবিক। বহু বছর আগে সেখানে বিশ্বাস করা হত—যে নারীর দাঁত কালো, তিনি বেশি পরিণত, মার্জিত এবং সামাজিকভাবে সম্মানিত। ফলে অনেক নারী ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের সাদা দাঁত কালো করে ফেলতেন।
এটা কেবল সৌন্দর্যের বিষয় ছিল না। সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার জন্যও অনেকেই এই প্রথা অনুসরণ করতেন। যেমন আমরা আজ ফ্যাশনের জন্য দাঁত ব্রেস করি বা স্কিন ট্রিটমেন্ট নিই, ঠিক তেমনি তখন কালো দাঁত ছিল সৌন্দর্যচর্চার অংশ।
ইতিহাস বলছে আরও পুরনো গল্প
একসময় গবেষকরা মনে করতেন, ভিয়েতনামে দাঁত কালো করার প্রথা শুরু হয় প্রায় ১৮০০ শতকের দিকে। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ভিন্ন কথা বলছে। পুরনো মানবদেহের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্রায় দুই হাজার বছর আগেও এই অঞ্চলে দাঁত কালো করার প্রচলন ছিল।
মানে, এটা হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো ট্রেন্ড নয়। বরং এটি গভীর সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে জড়িত একটি প্রাচীন ঐতিহ্য, যা বহু প্রজন্ম ধরে টিকে ছিল।
দাঁত কালো করার প্রক্রিয়া কতটা কঠিন ছিল?
শুনে মনে হতে পারে—দাঁত কালো করা বুঝি সহজ ব্যাপার। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল সময়সাপেক্ষ ও ধৈর্যের কাজ।
সাধারণত পেশাদার লোকজন এই কাজ করতেন। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগত। বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান ও বিশেষ রং ব্যবহার করে ধীরে ধীরে দাঁতকে কুচকুচে কালো করা হত। লক্ষ্য থাকত—রং যেন স্থায়ী হয় এবং সহজে উঠে না যায়।
ভাবুন তো, আজ আমরা দাঁত সাদা করতে কত যত্ন নিই। সেখানে মানুষ উল্টো এত কষ্ট করে দাঁত কালো করত—শুধু সামাজিক সৌন্দর্যের মানদণ্ড পূরণ করার জন্য।
শুধু ফ্যাশন নয়, ছিল ব্যবহারিক কারণও
অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, এর পেছনে কেবল সৌন্দর্যের ধারণাই কাজ করেনি। কিছু ব্যবহারিক কারণও ছিল। ধারণা করা হয়, দাঁতে ব্যবহৃত কালো প্রলেপ দাঁতকে পোকা বা ক্ষয় থেকে কিছুটা সুরক্ষা দিত।
গ্রামীণ জীবনে যেখানে আধুনিক ডেন্টাল কেয়ার ছিল না, সেখানে এই পদ্ধতি দাঁত মজবুত রাখার একটি উপায় হিসেবেও দেখা হত। যদিও আজকের বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে বিষয়টি পুরোপুরি প্রমাণিত নয়, তবুও ঐতিহাসিকভাবে এই বিশ্বাস বেশ শক্ত ছিল।
আধুনিক সময়ে প্রথার অবস্থান
সময় বদলেছে, মানুষের সৌন্দর্যবোধও বদলেছে। এখন ভিয়েতনামের শহুরে সমাজে সাদা দাঁতই বেশি জনপ্রিয়। তরুণ প্রজন্ম আধুনিক ডেন্টাল কেয়ারের দিকে ঝুঁকেছে।
তবে এই ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। এখনও দেশের কিছু বয়স্ক মানুষ এবং কয়েকটি প্রাচীন জনজাতির মধ্যে দাঁত কালো করার সংস্কৃতি টিকে আছে। তাদের কাছে এটি শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, বরং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ।
একভাবে দেখলে, এটি যেন জীবন্ত ইতিহাস—যা মানুষের শরীরেই বহন করা হচ্ছে।
বিশ্বের অন্য সংস্কৃতির সঙ্গে তুলনা
আমরা সাধারণত ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে সাদা দাঁতকে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখি। বিয়ের আগে দাঁত পরিষ্কার করা, টুথ হোয়াইটেনিং—এসব এখন খুব সাধারণ বিষয়।
কিন্তু ভিয়েতনামের এই প্রথা মনে করিয়ে দেয়, সৌন্দর্যের সংজ্ঞা আসলে সমাজভেদে কতটা আলাদা হতে পারে। যে জিনিস এক দেশে অপছন্দের, অন্য দেশে সেটাই সম্মানের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
সৌন্দর্যের ধারণা আসলে কতটা আপেক্ষিক
এই গল্পটা আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। আমরা যেটাকে “স্বাভাবিক” বা “সুন্দর” ভাবি, সেটা আসলে সংস্কৃতি ও সময়ের ওপর নির্ভর করে বদলে যায়।
আজকের দিনে কালো দাঁত হয়তো আমাদের চোখে অস্বাভাবিক লাগে। কিন্তু একসময় ভিয়েতনামের বহু নারী গর্বের সঙ্গে এই রীতি মেনে চলতেন। তাদের কাছে এটি ছিল পরিচয়, ঐতিহ্য এবং সামাজিক মর্যাদার অংশ।
ঠিক যেমন আজ আমরা ফ্যাশন, স্কিন কেয়ার বা কসমেটিক ট্রেন্ড অনুসরণ করি—ভবিষ্যতে সেগুলোর অনেক কিছুই হয়তো অদ্ভুত মনে হবে।
শেষ কথা
দাঁত মানেই ঝকঝকে সাদা—এই ধারণা আমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, সৌন্দর্যের সংজ্ঞা কখনও একরকম ছিল না। ভিয়েতনামের দাঁত কালো করার ঐতিহ্য তারই একটি চমৎকার উদাহরণ।
আজ এই প্রথা অনেকটাই কমে গেলেও, এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সংস্কৃতি মানুষের জীবনযাপন, সৌন্দর্যবোধ এবং সামাজিক মূল্যবোধকে কত গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাই কোনো কিছুকে শুধু নিজের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার না করে, তার পেছনের ইতিহাস ও সংস্কৃতিও বোঝার চেষ্টা করা সবসময়ই দরকার।
কারণ সৌন্দর্য—শেষ পর্যন্ত—চোখে নয়, সংস্কৃতির ভেতরেই লুকিয়ে থাকে।



