বাংলাদেশের শিল্প ও খনিজ খাতে গুরুত্বপূর্ণ এক চালান প্রবেশ করেছে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে। ভারতের পেট্রাপোল স্থলবন্দর হয়ে ৮টি ট্রাকে করে মোট ১২৫ মেট্রিক টন বিস্ফোরক দ্রব্য আমদানি হয়েছে বাংলাদেশে। শনিবার (২৪ জানুয়ারি) বিকাল ৪টার দিকে এই বিস্ফোরক দ্রব্যের চালানটি বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করে। খনিশিল্পে ব্যবহারের জন্য আনা এই বিস্ফোরক দ্রব্যকে কেন্দ্র করে বন্দরে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
বেনাপোল বন্দর সূত্র জানায়, ভারতের পেট্রাপোল স্থলবন্দর থেকে বিস্ফোরক দ্রব্যবোঝাই ট্রাকগুলো সীমান্ত অতিক্রম করে বিকালের দিকে বেনাপোল বন্দরে পৌঁছায়। আমদানিকৃত এই বিস্ফোরক দ্রব্য মূলত দিনাজপুরের মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের খনন কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য আনা হয়েছে।
বিস্ফোরক দ্রব্য হওয়ায় বন্দর এলাকায় প্রবেশের পরপরই চালানগুলো নির্দিষ্ট ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ডে নেওয়া হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। কোনো ধরনের ঝুঁকি এড়াতে পুরো প্রক্রিয়াটি কঠোর নজরদারির মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
এই বিস্ফোরক দ্রব্যের চালানটি আমদানি করেছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি দিনাজপুরের মধ্যপাড়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রানাইট খনন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
অন্যদিকে, বিস্ফোরক দ্রব্যটি রফতানি করেছে ভারতের সুপার সিভা শক্তি ক্যামিকেল প্রাইভেট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা ভারতের শ্রীপুরা এলাকায় অবস্থিত। আমদানিকৃত পণ্য চালানের বিপরীতে এলসি নম্বর ০০১২২৫০১০১২০, যার তারিখ ১৫ অক্টোবর ২০২৫। এছাড়া কমার্শিয়াল ইনভয়েস নম্বর হিসেবে উল্লেখ রয়েছে এস এস এস সিপি এল/এক্সপোর্ট/০০৪।
বেনাপোল স্থলবন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (ট্রাফিক) শামিম হোসেন জানান, দিনাজপুরের মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের খনন কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে এই বিস্ফোরক দ্রব্য আমদানি করা হয়েছে। খনির পাথর উত্তোলনের কাজে এই বিস্ফোরক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও জানান, মোট ১২৫ মেট্রিক টন ওজনের বিস্ফোরক দ্রব্য বর্তমানে বেনাপোল বন্দরের ৩১ নম্বর ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ডে প্রশাসনিক নিরাপত্তায় রাখা হয়েছে। বিস্ফোরক হওয়ায় এগুলো আলাদা জায়গায় সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং সাধারণ পণ্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা হচ্ছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বিস্ফোরক দ্রব্য খালাসের জন্য প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করবেন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মনোনীত সিঅ্যান্ডফ এজেন্ট। কাস্টমস যাচাই-বাছাই শেষে অনুমোদন মিললে খালাস কার্যক্রম শুরু হবে।
খালাস প্রক্রিয়া শেষ হলে বিস্ফোরক দ্রব্যগুলো ভারতীয় ট্রাক থেকে নামিয়ে বাংলাদেশি ট্রাকে স্থানান্তর করা হবে। এরপর সেগুলো কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দিনাজপুরের মধ্যপাড়া গ্রানাইট খনিতে পাঠানো হবে। পুরো পরিবহন প্রক্রিয়াতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিস্ফোরক দ্রব্য আমদানিকে ঘিরে বেনাপোল বন্দর এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টমস এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা যাতে না ঘটে, সেজন্য বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
বন্দর কর্মকর্তারা জানান, বিস্ফোরক দ্রব্যের মতো সংবেদনশীল পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিধিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে। আগুন নির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি সেবা এবং নিরাপত্তা প্রোটোকল সবই প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপাড়া গ্রানাইট খনি বাংলাদেশের খনিজ সম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এই খনির উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে নিয়মিত বিস্ফোরক দ্রব্যের প্রয়োজন হয়। ভারত থেকে আমদানি করা এই বিস্ফোরক দ্রব্য খনির উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এতে একদিকে যেমন দেশের শিল্প খাতে গতি আসবে, অন্যদিকে বিদেশ থেকে পাথর আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কিছুটা কমবে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়েও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এই খনন কার্যক্রম।
বেনাপোল বন্দর কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছে, বিস্ফোরক দ্রব্য খালাস ও পরিবহনের প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। বন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (ট্রাফিক) শামিম হোসেন বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই বিস্ফোরক দ্রব্য খালাস করা হবে। এ বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
তিনি আরও জানান, বন্দর এলাকায় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা বহাল থাকবে।
সব মিলিয়ে, বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে ১২৫ মেট্রিক টন বিস্ফোরক দ্রব্য আমদানি বাংলাদেশের শিল্প ও খনিজ খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কঠোর নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে এই চালান খালাস ও পরিবহন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয়ে যাতে কোনো ধরনের ঝুঁকি ছাড়াই বিস্ফোরক দ্রব্য মধ্যপাড়া গ্রানাইট খনিতে পৌঁছাতে পারে, সে লক্ষ্যেই কাজ করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন।


