মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছাতেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারে শুরু হয়েছে তীব্র অস্থিরতা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণার পর ইউরোপের গ্যাসের দাম হঠাৎ করে লাফিয়ে বেড়েছে। বিনিয়োগকারী, শিল্প মালিক, সাধারণ ভোক্তা—সবার চোখ এখন জ্বালানির বাজারে। কারণ গ্যাসের দাম বাড়া মানে শুধু বিল বাড়া নয়, পুরো অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হওয়া।
ইরানের সামরিক বাহিনী Islamic Revolutionary Guard Corps (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইউরোপীয় গ্যাসবাজারে অস্থিরতা শুরু হয়। হরমুজ প্রণালী এমন একটি কৌশলগত রুট, যেটি দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হয়। এই পথ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়া মানেই বৈশ্বিক সরবরাহে ধাক্কা।
লন্ডনের ICE Futures Europe–এর তথ্য অনুযায়ী, একদিনেই প্রতি হাজার ঘনমিটার গ্যাসের দাম প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়ে ৭৮৫ ডলারে পৌঁছায়। ২০২৩ সালের জানুয়ারির পর এটি ছিল সর্বোচ্চ মূল্য। পরে দাম কিছুটা কমে ৭০০ ডলারের আশেপাশে আসে, কিন্তু বাজারে আতঙ্ক কমেনি।
ভাবুন তো, একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখলেন আপনার রান্নার গ্যাসের দাম হঠাৎ অর্ধেকেরও বেশি বেড়ে গেছে। মাসের হিসাব একেবারে এলোমেলো হয়ে যাবে, তাই না? ইউরোপের শিল্পখাত ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার অবস্থাও এখন অনেকটা তেমন।
দামের পাশাপাশি সরবরাহ নিয়েও বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান QatarEnergy সাময়িকভাবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি উৎপাদন স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। সম্ভাব্য ইরানি হামলার ঝুঁকি বিবেচনা করেই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কাতার বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার পর তাদের অবস্থান খুবই শক্ত। বছরে প্রায় ৭৭ মিলিয়ন টন উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে তারা বৈশ্বিক বাজারে বড় ভূমিকা রাখে। ভবিষ্যতে এই সক্ষমতা ১৪২ মিলিয়ন টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বর্তমান সংকট সেই পরিকল্পনাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
ইউরোপের অনেক দেশ রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের গ্যাসের দিকে ঝুঁকেছিল। এখন সেই ভরসার জায়গাতেই ফাটল ধরেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি United States এবং Israel যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সামরিক অভিযান চালায়। রাজধানী তেহরানসহ একাধিক কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হয়। White House দাবি করে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল।
হামলার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা Ali Khamenei–সহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হওয়ার খবর বিভিন্ন সূত্রে উঠে আসে। ইরানের মানবিক সংস্থা Iranian Red Crescent Society জানায়, দেশজুড়ে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
এই ঘটনাগুলো শুধু রাজনৈতিক উত্তেজনাই বাড়ায়নি, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযানের জবাবে ইরান ‘অপারেশন ট্রু প্রোমিস ৪’ নামে পাল্টা হামলা শুরু করেছে বলে ইরানি গণমাধ্যমে দাবি করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
পাল্টাপাল্টি হামলায় পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে নিরাপদ খাতে অর্থ সরিয়ে নিচ্ছেন। তেল ও গ্যাসের বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। কারণ পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয়, তাহলে সরবরাহ পুরোপুরি ব্যাহত হতে পারে।
হরমুজ প্রণালীকে বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের লাইফলাইন বলা হয়। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও এলএনজি এই রুট দিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও আমেরিকায় পৌঁছে। এই পথ বন্ধ হওয়া মানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সরাসরি ধাক্কা।
আইআরজিসির এক কমান্ডার সতর্ক করে বলেছেন, অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে হামলা চালানো হবে। এর পর আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো বিকল্প রুট খুঁজতে শুরু করেছে। কিন্তু বিকল্প পথ মানেই অতিরিক্ত সময় ও খরচ। আর শেষ পর্যন্ত সেই খরচ যোগ হয় পণ্যের দামে।
ধরুন, কোনো ট্রাক যদি ছোট রাস্তা বাদ দিয়ে বড় ঘুরপথে যেতে বাধ্য হয়, তাহলে তার ডিজেল খরচ বাড়বে, সময় লাগবে বেশি। ঠিক তেমনভাবেই জ্বালানি পরিবহনের খরচ বাড়লে তার প্রভাব পড়ে পুরো বাজারে।
ইউরোপ গত কয়েক বছরে একাধিক জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এখন নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তাহলে ইউরোপে গ্যাসের দাম আরও বাড়তে পারে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে যেতে পারে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচও বাড়বে।
শীতের সময় ঘর গরম রাখা, রান্না করা, বিদ্যুতের বিল পরিশোধ—সবকিছুতেই চাপ পড়বে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ভুগতে পারে।
জ্বালানির দাম বাড়া মানে শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়। পরিবহন খরচ বাড়লে খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায়। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে ব্যবসায়ীরা সেই বাড়তি খরচ ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেন। ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে।
উন্নয়নশীল দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ তারা জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ে। বাজেট ঘাটতি বেড়ে যায়।
বিশ্ববাজার এখন কূটনৈতিক সমাধানের দিকে তাকিয়ে আছে। আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো না গেলে এই অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি যেন এক টানটান দড়ির ওপর হাঁটার মতো। সবাই অপেক্ষা করছে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য। হরমুজ প্রণালী কতদিন বন্ধ থাকবে? কাতার কবে আবার পূর্ণমাত্রায় এলএনজি উৎপাদন শুরু করবে? সামরিক উত্তেজনা কি আরও বাড়বে, নাকি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান আসবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ। আপাতত যা পরিষ্কার, তা হলো—মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাত সরাসরি ইউরোপের গ্যাসের দামে আগুন ধরিয়েছে। আর সেই আগুনের তাপ শুধু ইউরোপ নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতিই অনুভব করছে।
জ্বালানি বাজার এখন এক অস্থির মোড়ে দাঁড়িয়ে। সামান্য সিদ্ধান্ত, সামান্য পরিবর্তন—আর তার প্রভাব পড়ছে কোটি কোটি মানুষের জীবনে। তাই হরমুজ প্রণালী সংকট শুধু একটি আঞ্চলিক ইস্যু নয়, এটি এখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বড় পরীক্ষা।



