রঙের উৎসব দোল ও হোলি মানেই আনন্দ, ভ্রমণ আর উৎসবের আমেজ। এই সময় অনেকেই বন্ধু-পরিবার নিয়ে ঘুরতে বের হন, আবার অনেকেই উৎসবের আনন্দে পানীয় উপভোগ করেন। আর সেই কারণেই প্রতি বছর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে মদের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় দোল ও হোলি উপলক্ষে রেকর্ড পরিমাণ মদ বিক্রি হয়েছে, যার ফলে রাজ্য সরকারের আয়ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
আবগারি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে ৪ মার্চ—মাত্র চার দিনের মধ্যেই পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় প্রায় ৩০ কোটি ১১ লক্ষ টাকার মদ বিক্রি হয়েছে। এই বিপুল বিক্রি নতুন করে একটি রেকর্ড গড়েছে। পর্যটনকেন্দ্রিক এই জেলায় উৎসবের সময় মানুষের ভিড় এতটাই ছিল যে লাইসেন্সপ্রাপ্ত মদের দোকানগুলো প্রায় সারাদিনই ক্রেতায় ভরা ছিল।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো সমুদ্রসৈকত। দিঘা, মন্দারমণি, তাজপুরসহ বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় সমুদ্র পর্যটন কেন্দ্র এই জেলার মধ্যেই অবস্থিত। ছুটির সময় বা উৎসবের মরশুমে স্বাভাবিকভাবেই এখানে মানুষের ভিড় বেড়ে যায়।
দোল ও হোলির সময়ও একই চিত্র দেখা গেছে। রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে যেমন পর্যটকরা এসেছেন, তেমনি ভিনরাজ্য থেকেও বহু মানুষ ঘুরতে এসেছেন সমুদ্রের টানে। অনেকেই পরিবার নিয়ে ছুটি কাটাতে এসেছেন, আবার অনেক তরুণ-তরুণী বন্ধুদের সঙ্গে উৎসব উপভোগ করতে এখানে ভিড় জমিয়েছেন। এই বিপুল পর্যটকের উপস্থিতির কারণেই স্থানীয় বাজার, হোটেল এবং মদের দোকানগুলোতে বিক্রি বেড়েছে কয়েকগুণ।
উৎসবের এই চার দিনে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মোট ২৮৮টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত মদের দোকান খোলা ছিল। এসব দোকানে ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেক জায়গায় সকাল থেকেই লম্বা লাইন দেখা গেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই চার দিনে—
- প্রায় ২ লক্ষ ৭৭ হাজার লিটার বাংলা মদ বিক্রি হয়েছে
- প্রায় ১ লক্ষ ৮৬ হাজার লিটার বিদেশি মদ বিক্রি হয়েছে
- প্রায় ১ লক্ষ ৮৫ হাজার লিটার বিয়ার বিক্রি হয়েছে
এই বিশাল পরিমাণ বিক্রি থেকেই বোঝা যায় উৎসবের সময় পানীয়ের চাহিদা কতটা বেড়ে যায়। পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষও এই সময় কেনাকাটা করেছেন বেশি।
দোলের আগের দিন অর্থাৎ ১ মার্চ থেকেই মদ বিক্রি শুরু হয় জোরেশোরে। সেদিনই জেলার বিভিন্ন দোকানে ৭ কোটি ২১ লক্ষ ৯ হাজার ৭৫২ টাকার মদ বিক্রি হয়েছে।
এত বড় অঙ্কের বিক্রি সাধারণ সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। কারণ উৎসবের আগে অনেকেই আগেভাগেই কেনাকাটা করে রাখেন। ফলে প্রথম দিন থেকেই বাজারে চাহিদা তুঙ্গে ওঠে।
পরদিন অর্থাৎ ২ মার্চ বিক্রির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। সেদিন—
- দেশি মদ বিক্রি হয়েছে ৯৪ হাজার ৮১৩ লিটার
- বিদেশি মদ বিক্রি হয়েছে ৬৫ হাজার ৫২৪ লিটার
- বিয়ার বিক্রি হয়েছে ৫৪ হাজার ৪৭২ লিটার
সব মিলিয়ে ওই একদিনেই মোট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ কোটি ২৪ লক্ষ ৩৬ হাজার ৪০ টাকা। দোল উৎসবের আগে এই বিপুল বিক্রি রাজ্যের রাজস্ব আয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
৩ মার্চেও মদের বিক্রি কমেনি। সেদিন বিভিন্ন দোকানে—
- দেশি মদ বিক্রি হয়েছে ৪৮ হাজার ৩৪৯ লিটার
- বিদেশি মদ বিক্রি হয়েছে ৩৭ হাজার ৯২০ লিটার
- বিয়ার বিক্রি হয়েছে ৩৬ হাজার ২৯৮ লিটার
এই বিক্রি থেকে রাজ্যের আয় হয়েছে প্রায় ৫ কোটি ৮৬ লক্ষ ২৯ হাজার ২৭২ টাকা।
অনেক সময় দেখা যায় উৎসবের দিন শেষে বিক্রি কমে যায়। কিন্তু এবার দোলের পরদিনও বিক্রি ছিল উল্লেখযোগ্য। ৪ মার্চ অর্থাৎ দোলের পরদিন মোট ৬ কোটি ৮০ লক্ষ ১২ হাজার ৮৭০ টাকার মদ বিক্রি হয়েছে।
এই দিনের হিসাব অনুযায়ী—
- দেশি মদ বিক্রি হয়েছে ৬৬ হাজার ৬৭৯ লিটার
- বিদেশি মদ বিক্রি হয়েছে ৪০ হাজার ২৪৫ লিটার
- বিয়ার বিক্রি হয়েছে ৪৪ হাজার ২৮৩ লিটার
ফলে চার দিনের মোট বিক্রির পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩০ কোটি ১১ লক্ষ টাকা।
উৎসবের সময় শুধু বৈধ দোকানেই নয়, অনেক সময় বেআইনি মদের ব্যবসাও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তাই আবগারি দপ্তর এই সময় বিশেষ নজরদারি চালায়।
জেলা আবগারি দপ্তরের সুপার মণীশ শর্মা জানিয়েছেন, উৎসবের সময় জুড়ে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালানো হয়েছে। এই অভিযানে ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বেআইনি মদের কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগে।
তিনি আরও জানান, প্রশাসন সবসময় চেষ্টা করে যাতে মানুষ নিরাপদ এবং বৈধ উপায়ে কেনাকাটা করতে পারে। তাই অবৈধ মদের বিরুদ্ধে অভিযান চলতেই থাকবে।
দোল ও হোলির মতো বড় উৎসবগুলো শুধু সামাজিক আনন্দই নিয়ে আসে না, অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে পর্যটন এলাকা হলে সেই প্রভাব আরও বেশি দেখা যায়।
দিঘা বা মন্দারমণির মতো জায়গায় যখন হাজার হাজার মানুষ ঘুরতে আসে, তখন হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং মদের দোকান—সবখানেই বিক্রি বেড়ে যায়। ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রাজ্য সরকারের রাজস্ব আয়—সব জায়গাতেই লাভ হয়।
এই বছরের রেকর্ড বিক্রি সেটাই আবার প্রমাণ করল। মাত্র চার দিনে ৩০ কোটির বেশি টাকার মদ বিক্রি হওয়া সত্যিই বড় একটি সংখ্যা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটন এবং উৎসব একসঙ্গে হলে স্থানীয় অর্থনীতি দ্রুত চাঙা হয়ে ওঠে। দিঘা, মন্দারমণি বা তাজপুরে দোলের সময় যে ভিড় দেখা গেছে, তা শুধু বিনোদনের জন্য নয়—এটি স্থানীয় ব্যবসার জন্যও বড় সুযোগ।
হোটেল বুকিং বেড়েছে, রেস্তোরাঁয় ভিড় ছিল, সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের ভিড় লেগেই ছিল। তার সঙ্গে মদের বিক্রিও ছিল চোখে পড়ার মতো।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এবারের দোল ও হোলি উৎসব পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় শুধু আনন্দই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড় সাফল্য এনে দিয়েছে।
দোল ও হোলি উৎসবকে কেন্দ্র করে পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় যে বিপুল মদ বিক্রি হয়েছে, তা নতুন এক রেকর্ড তৈরি করেছে। মাত্র চার দিনে প্রায় ৩০ কোটি ১১ লক্ষ টাকার মদ বিক্রি রাজ্যের রাজস্ব আয়ে বড় অবদান রেখেছে।
পর্যটকদের ভিড়, সমুদ্রসৈকতের আকর্ষণ এবং উৎসবের আনন্দ—এই তিনের মিলিত প্রভাবেই এমন রেকর্ড বিক্রি সম্ভব হয়েছে। প্রশাসনের নজরদারি এবং বেআইনি ব্যবসার বিরুদ্ধে অভিযানের ফলে পরিস্থিতিও ছিল অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে।
সব মিলিয়ে এবারের রঙের উৎসব শুধু রঙেই নয়, অর্থনীতির দিক থেকেও রাজ্যকে করেছে আরও সমৃদ্ধ।



