বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে বহু নারী ক্রীড়াবিদ তাঁদের প্রতিভা ও অবদানের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। এর মধ্যে যশোরের কৃতি ক্রীড়াবিদ নাহার সিদ্দিকী জুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ছিলেন ভলিবল, হ্যান্ডবল এবং অ্যাথলেটিকসের একাধারে পারদর্শী একজন ক্রীড়াবিদ। তাঁর জন্ম ১৯৬৬ সালের ১লা জুন যশোর শহরের চুড়িপট্টির হাজী আব্দুল করিম রোডে। ক্রীড়ামুখর পরিবারে জন্ম নেওয়ায় ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে তাঁর।
নাহার সিদ্দিকী জুলির পিতা জাহাঙ্গীর সিদ্দিকী ছিলেন একজন ফুটবলার। তাঁর পরিবারে খেলাধুলার একটি গভীর ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল। পিতৃব্য আলমগীর সিদ্দিকী, সালাউদ্দীন সিদ্দিকী ও তারিক সিদ্দিকী প্রমুখও ছিলেন সুপরিচিত ক্রীড়াবিদ। এ কারণে পরিবার থেকেই তিনি খেলাধুলার অনুপ্রেরণা পান। ছোটবেলা থেকেই বিদ্যালয়ের মাঠে এবং স্থানীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে খেলোয়াড় হিসেবে নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি বি.এ. অনার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলাকেই জীবনের প্রধান অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়েছিলেন।
বিদ্যালয় পর্যায়েই তিনি ভলিবল ও অ্যাথলেটিকসে অংশগ্রহণ শুরু করেন। যশোরের এম এস টি পি গার্লস স্কুলের পক্ষে জেলা ও বিভাগীয় প্রতিযোগিতায় তিনি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। অ্যাথলেটিকসের বিভিন্ন ইভেন্টে সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি ভলিবল খেলায়ও দক্ষতার প্রমাণ দেন।
১৯৮২ সালে নাহার সিদ্দিকী জুলি হ্যান্ডবল খেলার সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর প্রথম প্রশিক্ষক ছিলেন সৈয়দ আলী আনোয়ার, যিনি যশোর জেলার ক্রীড়াঙ্গনে সুপরিচিত একজন প্রশিক্ষক। তাঁর অধীনে নিয়মিত অনুশীলন করে দ্রুতই হ্যান্ডবল খেলায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৮৩ সালে তিনি খুলনা বিভাগীয় মহিলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষে পশ্চিমবঙ্গে অনুষ্ঠিত একাধিক প্রদর্শনী খেলায় অংশগ্রহণ করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ধরনের প্রদর্শনী খেলা তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও দৃঢ় করে।
১৯৮৪ সালে যশোর ষ্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে যশোর জেলা মহিলা হ্যান্ডবল দল পশ্চিমবঙ্গের মহিলা হ্যান্ডবল দলের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এই ম্যাচে অংশ নিয়ে নাহার সিদ্দিকী জুলি নিজেকে জেলার অন্যতম প্রধান ক্রীড়াবিদ হিসেবে প্রমাণ করেন।
১৯৮২ সাল থেকে টানা চার-পাঁচ বছর তিনি যশোর জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার হয়ে হ্যান্ডবলে অংশগ্রহণ করেন। এই সময়ে তিনি খুলনা বিভাগীয় প্রতিযোগিতায় রানার্স আপ হন এবং দলের অধিনায়কের দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন।
নাহার সিদ্দিকী জুলির ক্রীড়াজীবন ছিল সাফল্যমণ্ডিত। তিনি শুধু একজন খেলোয়াড়ই ছিলেন না, বরং দলের নেতৃত্ব দেওয়ার দক্ষতাও দেখিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে যশোর জেলা মহিলা হ্যান্ডবল দল বারবার সাফল্য অর্জন করে।
ভলিবল, অ্যাথলেটিকস এবং হ্যান্ডবল—এই তিনটি ক্ষেত্রেই তাঁর পারদর্শিতা যশোর তথা খুলনা বিভাগের ক্রীড়াঙ্গনে তাঁকে এক বিশেষ মর্যাদায় আসীন করেছে।
যশোরের ক্রীড়া ইতিহাসে নাহার সিদ্দিকী জুলির অবদান ভোলার নয়। তিনি শুধু নিজে খেলাধুলায় সাফল্য অর্জন করেননি, বরং পরবর্তী প্রজন্মের নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
নারীরা খেলাধুলায় পিছিয়ে থাকবে না—এই বার্তাটি তিনি তাঁর ক্রীড়াজীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন। বিশেষ করে হ্যান্ডবলের মতো তুলনামূলক নতুন খেলায় নারীদের অংশগ্রহণে তিনি অনন্য ভূমিকা রেখেছেন।
যশোর জেলা বরাবরই ক্রীড়াবান্ধব অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এখানকার ফুটবল, ক্রিকেট, হকি ও ভলিবলের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এর পাশাপাশি নারী ক্রীড়াবিদদের মধ্যে নাহার সিদ্দিকী জুলি ছিলেন অগ্রদূত। তাঁর অবদান যশোরের ক্রীড়া সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।
তাঁর নাম আজও যশোরের ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।
বাংলাদেশের নারী ক্রীড়া ইতিহাসে নাহার সিদ্দিকী জুলি এক অনন্য নাম। ভলিবল, হ্যান্ডবল ও অ্যাথলেটিকস—সবক্ষেত্রেই তাঁর দক্ষতা ও অবদান আজও ক্রীড়াপ্রেমীদের অনুপ্রেরণা জোগায়।
তাঁর জীবন ও ক্রীড়াজীবন আমাদের শেখায় যে, ইচ্ছা, পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে নারীরাও খেলাধুলায় উচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১৮ আগস্ট ২০২৫


