বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্বাধীন বাংলা ফুটবল একাদশ এক অনন্য অধ্যায়। সেই দলের অন্যতম কীর্তিমান খেলোয়াড় ছিলেন শেখ আব্দুল হাকিম। তাঁর জন্ম, শিক্ষা, খেলোয়াড়ি জীবন থেকে শুরু করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য—সবই তাঁকে বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত করেছে।
শেখ আব্দুল হাকিম ১৯৪৯ সালের ৪ ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বারাসাতের কাজীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শরাফাত আলী ও মাতা এক কন্যার পাশাপাশি ছিলেন একমাত্র পুত্রসন্তান। দেশভাগের পর ১৯৬৩ সালে পরিবারসহ তিনি যশোর উপশহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
খেলাধুলার পাশাপাশি শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন মনোযোগী।১৯৬৬ সালে যশোর মুসলিম একাডেমি থেকে এসএসসি পাস করেন।১৯৬৮ সালে যশোর এম এম কলেজ থেকে আইএ সম্পন্ন করেন।
খুব অল্প বয়সেই ফুটবলের প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর।১৯৬৫ সালে যশোর মডেল হাই স্কুলের হয়ে আন্তঃস্কুল খুলনা বিভাগীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন।একই বছর যশোর জেলা দলে অন্তর্ভুক্ত হন, যা তাঁর ক্যারিয়ারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক ছিল।
১৯৬৮ সালে ঢাকা জেলার বিপক্ষে ইস্ট পাকিস্তান যশোর জেলা দলের রানার্স-আপ অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একই বছর তিনি ইস্ট পাকিস্তান যুব দলে যশোরের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে খেলেন।
১৯৬৯ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান সম্মিলিত বিশ্ববিদ্যালয় দলের সদস্য হিসেবে মাঠে নামেন। কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টে পশ্চিম পাকিস্তানের পেশোয়ারের বিপক্ষে ২-১ গোলে হেরে গেলেও তাঁর দক্ষতা দর্শকদের মুগ্ধ করে। দলের অধিনায়ক ছিলেন জাকারিয়া পিন্টু।
পরে তিনি ঢাকার দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে খেলেন এবং সেই বছর ঢাকা লিগে রানার্স-আপ হন। দলে তখন ছিলেন ছয়জন বাঙালি ও পাঁচজন অবাঙালি খেলোয়াড়, যাদের মধ্যে ওমর, মুসা ও আবিদের মতো খেলোয়াড় ছিলেন উল্লেখযোগ্য।
১৯৭০ সালে শেখ আব্দুল হাকিম ইপিআইডিসি (বর্তমান বিজেএমসি)-তে যোগ দেন। একই সময়ে তিনি আগা খান গোল্ড কাপে অংশ নেন, যেখানে মালয়েশিয়া, পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস (পিআইএ), করাচি মিউনিসিপ্যাল ক্লাব (কেএমসি)-এর মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি স্বাধীন বাংলা ফুটবল একাদশের হয়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রদর্শনী ম্যাচে অংশগ্রহণ করেন। এলাহাবাদ, বিহার, বেনারস ও পাঞ্জাবসহ বহু স্থানে তাঁর খেলা মুক্তিকামী মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।১৯৭২ সালে আসামের গোহাটির বরদুলই শিল্ডে খেলেন।একই বছর ঢাকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে কলকাতা মোহনবাগানের বিপক্ষে ম্যাচে অংশগ্রহণ করেন।১৯৭২ সালের ৪ ও ১১ সেপ্টেম্বর পূর্ব বাংলার ঐতিহ্যবাহী ইস্ট বেঙ্গল দলের বিপক্ষেও খেলেন।১৯৭৩ ও ১৯৭৫ সালে তিনি মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ২১তম মারদেকা ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করেন, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ফুটবলের মর্যাদা বৃদ্ধি করে।১৯৬৮ সাল থেকে তিনি খুলনা প্লাটিনাম জুট মিলসে পার্সেল অফিসার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ফুটবলের বাইরে পরবর্তী সময়ে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন।
১৯৯৬ সালে তিনি যশোর জেলা চাঁদের হাট শাখা থেকে “শ্রেষ্ঠ ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব” নির্বাচিত হন। তাঁর অবদান শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলার প্রতি অনুপ্রাণিত করেছিলেন।
শেখ আব্দুল হাকিম ছিলেন শুধু একজন ফুটবল খেলোয়াড় নন, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে এক ক্রীড়াযোদ্ধা। তাঁর খেলাধুলার দক্ষতা, ত্যাগ ও অবদান স্বাধীন বাংলা ফুটবল একাদশকে সমৃদ্ধ করেছে এবং দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে তাঁকে স্থায়ীভাবে অমর করেছে।


