অভয়নগর উপজেলার ভৈরব নদীর উত্তর তীরে দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য স্থাপনা—অভয়নগরের পুরাতন থানাভবন। ১৮৭৫ সালের ১৬ মার্চ প্রতিষ্ঠিত এই থানাভবন কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। ব্রিটিশ আমলের ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যে নির্মিত এই ভবন আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে, মনে করিয়ে দেয় সেই সময়ের প্রশাসনিক ক্ষমতা, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য নৈপুণ্যের কথা।
ভবনটির নির্মাণশৈলীতে ভিক্টোরিয়ান আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় যেন কোনো রাজপ্রাসাদ। উঁচু ছাদ, মোটা লৌহ রড, ভারী কাঠের দরজা এবং শক্ত পাল্লা সেই সময়কার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও স্থাপত্যের দৃঢ়তার প্রমাণ বহন করে। সামনের ও পেছনের বিশাল গাছপালা ভবনটিকে আরও রাজসিক রূপ দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবনটি এখন জীর্ণ। ভাঙাচোরা দরজা-জানালা, ছাদের উপর জন্মানো ঘাস-লতা, মেঝেতে জমে থাকা ধুলো আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ঝোপঝাড় এর অবহেলিত অবস্থার সাক্ষী। তবু ভিতরে প্রবেশ করলে বোঝা যায়—সামান্য সংস্কারেই এটি আবার কার্যকর ও ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
পুরাতন থানাভবনের নিচতলায় ছিল অফিসঘর, কয়েদখানা ও অস্ত্রাগার। দর্শনার্থীরা এখনো সেই লৌহ রড, ভারী দরজা ও শক্ত পাল্লা দেখে শিহরিত হন। একসময় এই গারদের ভেতরে কত মানুষের কান্না, দুঃখ আর বেদনার ইতিহাস লুকিয়ে আছে, তার কোনো হিসাব নেই।
দোতালায় উঠলে দেখা যায় মানুষের আবেগময় ছাপ। দেয়ালে আঁকিবুকি, কবিতা, ক্যালিগ্রাফি কিংবা প্রেমের বাণী—সবই প্রমাণ করে যে এই ভবন শুধু প্রশাসনিক ইতিহাসই নয়, বরং মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতিরও অংশ হয়ে উঠেছিল।
অযত্ন ও অবহেলায় ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও অভয়নগরের পুরাতন থানাভবন এখনও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এর পাশেই রয়েছে বাঘুটিয়া ইউনিয়ন পুলিশ ফাঁড়ি ভবন, যা পুরাতন স্থাপনাটিকে কিছুটা হলেও রক্ষা করেছে।
এই ঐতিহাসিক ভবন শুধু অতীতের নিদর্শন নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্যও এক সম্ভাবনার আলো। সঠিক সংরক্ষণ ও সংস্কার করা হলে এটি সহজেই একটি ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। নতুন প্রজন্মের কাছে এটি শুধু দর্শনীয় স্থান নয়, বরং নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত হবার এক অসাধারণ মাধ্যম হবে।
অভয়নগরের পুরাতন থানাভবন আমাদের ঐতিহ্যের গর্ব। তবে সময়ের ক্ষয় ও অযত্নের কারণে এর অস্তিত্ব হুমকির মুখে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত উদ্যোগ নেয়, তবে ভবনটি শুধু অভয়নগরের গৌরবই নয়, সমগ্র বাংলাদেশের ইতিহাসেরও এক অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ০২-সেপ্টেম্ববর ২০২৫


