বাংলাদেশের ক্রীড়া অঙ্গনে এমন কিছু নাম আছে যাদের অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাঁদের একজন সৈয়দ আলী আনোয়ার। জুডো-কারাতে, কুস্তি, জিমন্যাস্টিকস থেকে শুরু করে হ্যান্ডবল পর্যন্ত বিভিন্ন খেলায় তিনি ছিলেন একাধারে প্রশিক্ষক, রেফারি ও সংগঠক।
সৈয়দ আলী আনোয়ারের জন্ম ১৯৫৭ সালে যশোর শহরের পুরাতন কসবা কাজীপাড়ার একটি পীর পরিবারে। তাঁর পৈতৃক নিবাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার পিয়ারডাঙ্গা গ্রামে। দেশভাগের সময় ১৯৪৭ সালে তাঁর পিতা চাকরিসূত্রে যশোরে স্থায়ী হন। চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে আলী আনোয়ার ছিলেন তৃতীয় সন্তান।
শৈশব থেকেই তিনি ক্রীড়ার প্রতি অনুরাগী ছিলেন। কর্মজীবনে বাংলাদেশ আনসার দলের জুডো প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। আলী আনোয়ার ছিলেন ৪র্থ ড্যান ব্ল্যাক বেল্টধারী এবং তিন দশকের বেশি সময় জাতীয় জুডো কারাতে রেফারি ও বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি বহু জাপানি বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে জুডো-কারাতে প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৮৫ সালে ভারত সফরে বাংলাদেশ কারাতে দলের কোচ-কাম-ম্যানেজার ছিলেন। ১৯৯৫ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ২য় রাজীব গান্ধী আন্তর্জাতিক জুডো প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ দলের কোচ হিসেবে নেতৃত্ব দেন।
তিনি দীর্ঘদিন যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার জুডো পরিষদের সম্পাদক ছিলেন। তাঁর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেছে। শুধু তাই নয়, অনেকেই জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিনিধিত্ব করেছে।
প্রথম ফেডারেশন কাপে তাঁর ছাত্রীরা বালিকা বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয় এবং বালক ও মহিলা বিভাগে রানার্সআপ হয়। ২য় ফেডারেশন কাপে তাঁর শিষ্যরা মোট ২২টি পদক (৬ স্বর্ণ, ৯ রৌপ্য ও ৭ ব্রোঞ্জ) জয় করে।
সৈয়দ আলী আনোয়ার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট ও দলের জুডো প্রশিক্ষক ছিলেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ রাইফেলস (বর্তমানে বিজিবি) ব্যাটালিয়নগুলোতেও তিনি জুডো ও কারাতে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ও বাংলাদেশ জুডো ফেডারেশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন।
জুডো-কারাতের পাশাপাশি কুস্তি খেলাতেও তিনি ছিলেন সমান দক্ষ। ২০০০ সালে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক জুনিয়র কুস্তি প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ দলের অফিসিয়াল ছিলেন এবং আন্তর্জাতিক রেফারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ২০০৩ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান কুস্তি প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জাতীয় পর্যায়ে বহু বছর কুস্তির রেফারি ও প্রশিক্ষক হিসেবে সুনাম অর্জন করেন।
২০০১ সালে আন্তর্জাতিক ওরিয়েন্টাল রেসলিং প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ দলকে রানার্সআপ করানোর কৃতিত্বও তাঁর।
জিমন্যাস্টিকসে তিনি অলিম্পিক সলিডারিটি কোর্সে উত্তীর্ণ প্রশিক্ষক ছিলেন। চীন, জাপান ও ইংল্যান্ডের কোচদের কাছ থেকে উন্নত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। যশোরে প্রথমবারের মতো জিমন্যাস্টিকস খেলা চালু করার কৃতিত্বও তাঁর।
১৯৮২ সালে যশোরে প্রথম হ্যান্ডবল খেলা চালু করেন সৈয়দ আলী আনোয়ার। সুইডেন, ইংল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড ও জাপানের কোচদের কাছে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। তাঁর গড়ে তোলা খেলোয়াড়দের মধ্যে নাহার সিদ্দিকী খুলনা বিভাগীয় মহিলা হ্যান্ডবল দলের হয়ে ভারত সফর করেন। যশোরের স্কুল, কলেজ ও ক্লাবগুলোতে হ্যান্ডবল জনপ্রিয় করে তোলার মূল কৃতিত্বও তাঁর।
সৈয়দ আলী আনোয়ার শুধু একজন খেলোয়াড় বা প্রশিক্ষক নন, তিনি ছিলেন ক্রীড়া অঙ্গনের এক অনন্য স্থপতি। জুডো-কারাতে, কুস্তি, জিমন্যাস্টিকস কিংবা হ্যান্ডবল—সব ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন অমলিন অবদান। তাঁর তৈরি অসংখ্য খেলোয়াড় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের জন্য গৌরব বয়ে এনেছে।
যশোর তথা বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে সৈয়দ আলী আনোয়ারের নাম তাই চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ২৮ আগস্ট ২০২৫


