বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে হকির যে সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, সেখানে কয়েকজন খেলোয়াড় তাঁদের প্রতিভা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে নিজেকে কিংবদন্তীর আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শেখ আশরাফুল হক পিন্টু তাঁদের অন্যতম। যশোর শহরের খড়কিতে ১৯৬০ সালের ১লা মার্চ জন্মগ্রহণ করা এই ক্রীড়াবিদের অবদান হকি খেলাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষাজীবন
শেখ আশরাফুল হক পিন্টু ছিলেন মোঃ আমিনুল হকের পঞ্চম সন্তান। সাত ভাইবোনের এই পরিবারে জন্ম নিয়ে তিনি যশোরের মাটি ও মানুষের ভালোবাসায় বড় হয়েছেন। শিক্ষা জীবনে তিনি বি এ (অনার্স) ও এম এ (অর্থনীতি) ডিগ্রি অর্জন করেন, যা তার বহুমুখী প্রতিভারই প্রমাণ।
পেশাগত জীবন ও সোনালী ব্যাংকে অবদান
১৯৮৬ সালে তিনি সোনালী ব্যাংকে একজন অফিসার হিসেবে যোগ দেন। শুধু খেলোয়াড় নয়, একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবেও তিনি নিজের যোগ্যতার ছাপ রেখেছেন। সোনালী ব্যাংক হকি দলের সহকারী ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন। এছাড়া তিনি “সোনালী ব্যাংক স্পোর্টস এ্যাণ্ড রিক্রিয়েশন ক্লাব” এর কোষাধ্যক্ষ হিসেবেও কাজ করেছেন, যেখানে তিনি ব্যাংকের খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
হকি ক্যারিয়ারের যাত্রা ও শুরুর ইতিহাস
১৯৭৩ সালে যশোর মুসলিম একাডেমী থেকে হকির যাত্রা শুরু করেন শেখ আশরাফুল। অল্প সময়ের মধ্যেই তার প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। ১৯৭৫ সাল থেকে যশোর হকি লীগে “আসাদ স্মৃতি সংঘ” এবং “বিমান” ক্লাবের পক্ষে খেলেন। দুই দলই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।
১৯৭৬ সাল থেকে যশোর জেলা হকি দলের নিয়মিত সদস্য হিসেবে খেলেন তিনি, এবং এই ভূমিকায় তিনি ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত থেকে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন।
জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে অবদান
- ১৯৭৯ সালে ঢাকা “পিডব্লিউডি” দলের হয়ে ঢাকা ১ম বিভাগ হকিতে অংশগ্রহণ।
- ১৯৮০ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা “ওয়ারী ক্লাব” এর হয়ে খেলার মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
- ১৯৮৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের হয়ে ১ম বিভাগ হকিতে খেলেছেন একনিষ্ঠতার সঙ্গে।
- ১৯৮১ সালে জাতীয় হকি প্রতিযোগিতায় রানার্স আপ দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন।
খুলনা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে অংশগ্রহণ
শুধু যশোর ও ঢাকায় নয়, খুলনা, রাজশাহী এবং চট্টগ্রামের হকি লীগেও তিনি বিভিন্ন দলে খেলে কৃতিত্বের ছাপ রেখেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা এবং পারদর্শিতা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খেলোয়াড়দের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
ফুটবল ক্যারিয়ারের সংক্ষিপ্ত অধ্যায়
হকির প্রতি ভালোবাসার পূর্বে পিন্টুর জীবনে ফুটবলেরও একটি অধ্যায় ছিল।
- ১৯৭৬ সালে “যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থা” আয়োজিত ফুটবল ক্যাম্পে অংশ নেন।
- একই বছর “প্রভাতী স্পোর্টিং ক্লাব” এর নিয়মিত খেলোয়াড় হিসেবে যশোর ফুটবল লীগে অংশ নেন।
তবে পরবর্তীতে হকির প্রতি প্রবল আগ্রহ ও উৎসাহের কারণে ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে হকিকেই স্থায়ী সঙ্গী হিসেবে বেছে নেন।
সংগঠক ও ক্লাব সদস্য হিসেবেও ভূমিকা
শেখ আশরাফুল হক পিন্টু শুধু একজন ক্রীড়াবিদ ছিলেন না, ছিলেন একজন সাংগঠনিক ব্যাক্তিত্ব।
- তিনি ছিলেন ওয়ারী ক্লাবের সাধারণ সদস্য, যেখানে তিনি হকির উন্নয়ন এবং নবীন খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণের কাজে নিজেকে জড়িয়ে রাখেন।
শেখ আশরাফুল হক পিন্টুর অবদান ও উত্তরাধিকার
বাংলাদেশের হকি ইতিহাসে শেখ আশরাফুল হক পিন্টুর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
- তাঁর দীর্ঘ হকি ক্যারিয়ার,
- ব্যাংকিং ও সংগঠন পরিচালনায় দক্ষতা,
- বিভিন্ন জেলার হকি উন্নয়নে অংশগ্রহণ,
এই সব মিলিয়ে তিনি ক্রীড়া জগতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
তিনি আজকের প্রজন্মের কাছে দৃঢ়তা, শৃঙ্খলা এবং পরিশ্রমের প্রতীক। নবীন খেলোয়াড়রা তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নিতে পারে, কীভাবে খেলাধুলা ও পেশাগত জীবনের সমন্বয় করা যায়।
এক বিস্মৃতপ্রায় কিংবদন্তির পুনরুজ্জীবন প্রয়োজন
বর্তমান সময়ের ক্রীড়াজগতে অতীতের নায়কদের অবদান স্মরণ করা প্রয়োজন, বিশেষ করে যখন তাঁরা দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শেখ আশরাফুল হক পিন্টুর মত খেলোয়াড়রা শুধু খেলার মাঠে নয়, সমাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় অবদান রেখে গেছেন। তাঁর কর্মময় জীবন বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।


