যশোর জেলার অভয়নগরের বাঘুটিয়ার জমিদারবাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে, যেন ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। ভগ্নপ্রায় দেয়াল, খসে পড়া কারুকাজ আর আগাছায় আচ্ছাদিত অঙ্গন দেখে মনে হতে পারে সবকিছু হারিয়ে গেছে। কিন্তু সত্যি বলতে, এই অট্টালিকার প্রতিটি ইট, প্রতিটি স্তম্ভ এখনও বহন করছে জমিদারি আমলের রাজকীয় ঐতিহ্যের গৌরবগাথা।
বাঘুটিয়ার জমিদারবাড়ির ইতিহাসের সূত্রপাত মুঘল যুগের শক্তিশালী সেনাপতি কালীদাস রায় চৌধুরীর হাতে। রাজা প্রতাপাদিত্যের প্রধান সেনাপতি হিসেবে তিনি খ্যাত ছিলেন। কবি ভারতচন্দ্র তাঁর কবিতায় কালীদাসকে ‘যুদ্ধকালে সেনাপতি কালী’ বলে প্রশংসা করেছিলেন।
শৈশব থেকেই অসাধারণ শক্তি ও কৌশলের জন্য খ্যাত কালীদাসকে প্রতাপাদিত্য ঢালী সৈন্যদের অধিনায়ক করেন। প্রতাপাদিত্যের পতনের পর তিনি সৈন্যদের সহায়তায় ইশফপুর পরগণা দখল করেন এবং ভৈরব নদীর তীরে নিজের আবাস গড়ে তোলেন। এখানেই শুরু হয় জমিদারি শাসনের নতুন অধ্যায়।
ইশফপুর দখলের পর কালীদাস রায় চৌধুরী গড়ে তোলেন বিশাল জমিদারবাড়ি, দুর্গ, মঠ ও অসংখ্য মন্দির। এলাকা এক অঘোষিত রাজধানীতে পরিণত হয়। ঢাকার সুবাদার কাশিম খানের কাছে উপহার পাঠালে বাদশাহ জাহাঙ্গীরের স্বাক্ষরিত সনদে তিনি পরগণার মালিকানা লাভ করেন। তখন থেকেই তিনি “রায় চৌধুরী” উপাধি পান।
কালীদাস রায় চৌধুরীর কন্যা বাণী সুন্দরীর বিয়ে হয় রামঘোষ দেব নামের এক বালীবংশীয় উত্তরাধিকারীর সাথে। জামাতার জন্য তিনি শুধু জমিদারির দায়িত্বই দেননি, বরং বাঘুটিয়ায় নির্মাণ করে দেন প্রাসাদোপম অট্টালিকা।
কন্যার নামেই গড়ে ওঠে বাণীপুর ও হরিশপুর মৌজা। ইতিহাসে পরিচিত রামদেব ঘোষ এই জমিদারবাড়ির ঘোষবংশের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর হাত ধরেই বাঘুটিয়ার জমিদারবাড়ির ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে।
যে অট্টালিকা একসময় রাজকীয় সিদ্ধান্ত ও আয়োজনের কেন্দ্রস্থল ছিল, আজ তা নিস্তব্ধ। ভগ্ন ছাদ, শ্যাওলাধরা দেয়াল, আর পাখিদের কোলাহলেই প্রতিধ্বনিত হয় অতীত। একসময় যে বাড়িতে অসংখ্য প্রদীপের আলোয় আলোকিত হত সভাকক্ষ, আজ তা অন্ধকারে ঢাকা।
তবু বিস্ময়করভাবে, সময়ের নির্মম আঘাতেও বাড়িটির আকার-আকৃতি, বিশালতা ও কারুকাজ এখনো মুগ্ধ করে। এটি বাংলার জমিদারি শাসনের উত্থান-পতনের জীবন্ত দলিল।
বাঘুটিয়ার জমিদারবাড়ি কেবল ভগ্নপ্রায় একটি প্রাসাদ নয়, বরং বাংলার জমিদারি আমলের ইতিহাসের অমূল্য সাক্ষ্য। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সংরক্ষণের অভাবে এটি ধ্বংসস্তূপের পথে।
যদি যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে এই প্রাচীন অট্টালিকা হয়ে উঠতে পারে এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র। ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক এবং পর্যটকদের জন্য এটি হতে পারে এক অনন্য আকর্ষণ, যেখানে বর্তমান ও আগামী প্রজন্ম খুঁজে পাবে অতীতের গৌরবময় অধ্যায়।
বাঘুটিয়ার জমিদারবাড়ি আজ ধ্বংসপ্রায় হলেও এর প্রতিটি ইট আজও উচ্চারণ করে—“আমাদেরও ছিলো একদিন স্বর্ণালী অতীত।”
বাংলার জমিদারি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অমূল্য অংশ হিসেবে এই অট্টালিকাটি সংরক্ষণের মধ্য দিয়েই কেবল বাঁচানো সম্ভব হবে অতীতের গৌরব, আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে যাবে সেই অমর মহিমা।


