বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন সরকারি প্রতিষ্ঠান। ১৮৬১ সালে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া নামে যাত্রা শুরু করে এ প্রতিষ্ঠান। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে প্রাচীন পুরাকীর্তি আইন অনুসারে গঠিত হয় প্রত্নতত্ত্ব ও জাদুঘর অধিদপ্তর, যা স্বাধীনতার পর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় এর প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হয়।
১৯৮৩ সালে বিভাগীয় পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে চারটি আঞ্চলিক কার্যালয় গঠিত হয়—ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে। বর্তমানে ঢাকা কার্যালয়ের আওতায় ময়মনসিংহ বিভাগ, খুলনার আওতায় বরিশাল, রাজশাহীর আওতায় রংপুর এবং চট্টগ্রামের আওতায় সিলেট বিভাগ অন্তর্ভুক্ত। তবে জেলাভিত্তিক প্রত্নতাত্ত্বিক কার্যালয় না থাকায় বহু প্রত্নস্থল সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষত রংপুরে দ্রুত একটি বিভাগীয় কার্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় মোট ৫৩৬টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: মহাস্থানগড়,ময়নামতি,শালবন বিহার,পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার,কান্তজীর মন্দির,ছোট সোনা মসজিদ,ষাটগম্বুজ মসজিদ,ভাসু বিহার,লালবাগ কেল্লা,রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি
এছাড়া অধিদপ্তরের আওতায় ৩১টি জাদুঘর ও প্রত্নস্থল দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় ২,০০০টি সংরক্ষণযোগ্য প্রত্নস্থল এখনো সঠিকভাবে তালিকাভুক্ত বা সুরক্ষিত হয়নি।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার ৫৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো দেশের ৬৪ জেলায় প্রত্নতাত্ত্বিক কার্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়নি। ফলে বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল অযত্নে হারিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন কারণে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বড় সংকটে পড়েছে—বাজেট ঘাটতি: অধিকাংশ প্রত্নস্থল ও জাদুঘরে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নেই।লোকবল সংকট: পর্যাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী না থাকায় প্রত্নস্থল রক্ষায় ধীরগতি লক্ষ্য করা যায়।অফিস ও অবকাঠামোর অভাব: জেলায় প্রত্নতত্ত্ব অফিস না থাকায় সরাসরি তদারকি সম্ভব হচ্ছে না।সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাব: বিগত বছরগুলোতে অন্তত ৩০টি প্রত্নস্থল তালিকা থেকে বাদ পড়েছে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে।
এছাড়া অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত অধিকাংশ জাদুঘরে সাইট অফিসে পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ নেই। খনন ও জরিপ কার্যক্রমও সীমিত আকারে পরিচালিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে বড় অন্তরায়।
অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে অধিকাংশ প্রত্নস্থল ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি কয়েকটি প্রস্তাবনা তুলে ধরেন—আটটি বিভাগীয় কার্যালয়ে আটজন পরিচালকের পদ সৃষ্টি।দিনাজপুর, পটুয়াখালী, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, যশোরসহ গুরুত্বপূর্ণ জেলায় আঞ্চলিক প্রত্নতাত্ত্বিক কার্যালয় চালু।উপজেলাভিত্তিক প্রত্নতাত্ত্বিক সহকারী পরিচালকের কার্যালয় প্রতিষ্ঠা।পাহাড়পুর, ষাটগম্বুজ মসজিদ ও লালবাগ কেল্লায় উপপরিচালকের কার্যালয় স্থাপন।
এছাড়া সাইটভিত্তিক সংরক্ষণ, খনন কাজের গতি বৃদ্ধি এবং পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো তৈরির উপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) সখে কামাল হোসেন জানান, রংপুর বিভাগে দ্রুত কার্যালয় চালু হবে। তবে সব জেলায় প্রত্নস্থল না থাকায় আপাতত জেলা পর্যায়ে অফিস খোলার পরিকল্পনা নেই। তিনি আরও বলেন, সিলেট বিভাগে খনন কার্যক্রম তুলনামূলক কম হয়েছে, আগামী মৌসুমে সেখানে নতুন খনন কাজ শুরু হবে এবং নতুন প্রত্নস্থল আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব কেবল ইতিহাস নয়, এটি জাতির পরিচয় বহন করে। কিন্তু বাজেট, লোকবল ও তদারকির অভাবে এই অমূল্য সম্পদ ধ্বংসের মুখে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাঠামোগত উন্নয়ন, আঞ্চলিক কার্যালয়ের বিস্তার এবং প্রযুক্তি-নির্ভর সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। কার্যকর পদক্ষেপ নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাংলাদেশের প্রত্নঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হবে।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ২২ আগস্ট ২০২৫


