বাংলা চলচ্চিত্রের আঙিনায় এমন এক শিল্পীর নাম উচ্চারণ করলেই যেন হাসির ঢেউ ওঠে, তিনি আর কেউ নন—ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ তাঁর জন্মদিনে স্মরণ করি এই অনন্য কৌতুক সম্রাটকে, যিনি শুধু হাসির উপহারই দেননি, বাঙালির মনোজগতে গেঁথে দিয়েছেন চিরকালীন আনন্দের স্মৃতি।
ভানুর আসল নাম ছিল সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯২০ সালের ২৬ আগস্ট মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে তাঁর জন্ম। ছোটবেলায় পড়াশোনার জন্য ভর্তি হন সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুলে, পরে পড়েন জগন্নাথ কলেজে। পড়াশোনা শেষে ১৯৪১ সালে কলকাতায় আসেন। প্রথমে চাকরিজীবন দিয়ে শুরু করলেও ভাগ্যের টানেই পৌঁছে যান টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়ায়, যেখানে শুরু হয় তাঁর রূপালি পর্দার সফর।
১৯৫৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছিল ভানুর জীবনের বড় মোড়। এই ছবির মাধ্যমে তিনি স্থায়ীভাবে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। পরের বছর ‘ওরা থাকে ওধারে’ ছবিতে ঘটি-বাঙালের চিরন্তন টানাপোড়েনকে তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন যে, উত্তমকুমার–সুচিত্রার মতো তারকারাও তাঁর ছায়া ম্লান করতে পারেননি।
ভানুর অভিনীত ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ (১৯৫৮) আজও বাংলা সিনেমার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা। দেবতাদের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন কিংবা ঊর্বশীকে শেখানো সেই বিখ্যাত ‘হাম–হাম–গুড়ি–গুড়ি নাচ’—সবই আজও দর্শককে হাসির সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়।
জহর রায়ের সঙ্গে তাঁর জুটি তো একেবারেই অনন্য। দু’জনের কমেডি রসায়ন এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, দর্শকরা ছবি দেখতে যেতেন শুধু ভানু-জহরের হাসির খুনসুটি উপভোগ করতে।
১৯৭১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’ প্রমাণ করে এই জুটি কতটা জনপ্রিয়। ভানুর সংলাপের টাইমিং, মুখভঙ্গি আর জহরের চটুল উত্তর—সব মিলিয়ে হাসির বিস্ফোরণ ঘটাতো সিনেমা হলে। আজও এই জুটি বাঙালির কাছে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
অনেকে ভানুকে শুধু কৌতুক অভিনেতা ভাবলেও তিনি ছিলেন এক বহুমাত্রিক শিল্পী। ‘পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট’ ছবিতে নায়কের ভূমিকায় তাঁর অভিনয় প্রমাণ করে, রোম্যান্টিক কিংবা গম্ভীর চরিত্রেও তিনি সমান দক্ষ।
ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় মানেই সংলাপের জাদু। “মাসিমা, মালপো খামু!” —এই একটি সংলাপই তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে। ১৯৮৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘৮০তে আসিও না’ ছবিতে মান্না দে’র কণ্ঠে তাঁর ঠোঁটে ফুটে ওঠা গান “তুমি আকাশ কখনো যদি হতে…” ছিল একই সঙ্গে রোম্যান্টিক ও হাস্যরসাত্মক।
১৯৮৩ সালে মাত্র ৬৩ বছর বয়সে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় চলে যান না–ফেরার দেশে। তাঁর শেষ ছবি ‘শোরগোল’ মুক্তি পায় ১৯৮৪ সালে। যিনি সারা জীবন মানুষকে হাসিয়েছিলেন, তাঁর চলে যাওয়া বাঙালিকে কাঁদিয়ে দিয়েছিল।
মঞ্চের বাইরে ভানু ছিলেন গম্ভীর স্বভাবের মানুষ। কিন্তু তাঁর স্বাভাবিক রসবোধ ছিল অসাধারণ। হয়তো সেই কারণেই তিনি এত সহজে মানুষকে আনন্দ দিতে পারতেন।
আজও যখন বাঙালি শুধু হাসতে চায়, তখন ভেসে আসে ভানুর সেই চেনা সংলাপ—
“মাসিমা, মালপো খামু!”
যতদিন বাংলা সিনেমা থাকবে, ততদিন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম থাকবে বাঙালির হাসির রোদ্দুর হয়ে।


