ভীমচন্দ্র দে — নামটি হয়তো জাতীয় পর্যায়ে প্রচারের আলোয় আসেনি, কিন্তু স্থানীয় ফুটবল ও ক্রীড়াঙ্গনে তিনি এক গৌরবময় ও সংগ্রামী চরিত্রের প্রতীক। এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব তাঁর জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, ক্রীড়াক্ষেত্রে তাঁর অবদান, এবং সমাজে তাঁর অবিনাশী ছাপ।
ভীমচন্দ্র দে: শিকড় ও পরিবার
ভীমচন্দ্র দে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৪ সালে যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলার বিভাগদী গ্রামে। পিতা বিশ্বনাথ দে এবং মা একজন গৃহিণী ছিলেন। পরিবারে তিনি ছিলেন দুই ভাই এবং এক বোনের মধ্যে সবার ছোট। তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এবং তিনি এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। শিক্ষা ও খেলাধুলার মধ্যে এক অসাধারণ ভারসাম্য রেখে এগিয়ে গেছেন তিনি।
শৈশব ও ফুটবলের প্রতি আগ্রহ
ভীমচন্দ্র দে ফুটবলের প্রতি আকৃষ্ট হন অল্প বয়সেই। ১৯৬৭ সালে নওয়াপাড়া শংকরপাশা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালীন আন্তঃস্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাঁর ফুটবল যাত্রার সূচনা হয়। স্কুল পর্যায়ের ফুটবলে তাঁর দৃঢ় উপস্থিতি এবং দক্ষতা দেখে স্থানীয় ক্রীড়ামহলে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন।
প্রশিক্ষণ ও পশ্চিম পাকিস্তান সফর
১৯৬৯ সালে তিনি অংশগ্রহণ করেন ঢাকায় অনুষ্ঠিত এ্যাথলেটিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। এখান থেকেই তাঁর খেলোয়াড়ি মানসিকতা আরও শাণিত হয়। পরবর্তীতে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত একটি ক্রীড়া আসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, যা সেই সময়ে একটি বিরল সুযোগ ও সম্মান হিসেবে বিবেচিত ছিল।
কলেজ ফুটবলে দৃপ্ত পদক্ষেপ
১৯৭৪ সালে ভীমচন্দ্র দে যশোর আন্তঃকলেজ ফুটবল দলের সদস্য হিসেবে রাজশাহীতে অংশগ্রহণ করেন। কলেজ পর্যায়ে তাঁর নেতৃত্বগুণ ও রক্ষণভাগে স্ট্রং পারফরম্যান্স দলকে জয়ের ধারায় ধরে রাখতে সহায়ক হয়।
পেশাগত জীবন ও ফুটবল মিলন
পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি তাঁর পেশাজীবন গড়ে তোলেন ব্যাংকিং খাতে। তবে পেশার চাপ কখনোই তাঁর ক্রীড়াজীবনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেনি। বরং, তিনি অংশগ্রহণ করেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ফুটবল খেলায়।
“কার্পেটিং জুট মিলস” এবং “রাজ টেক্সটাইল” দলের পক্ষে অংশগ্রহণ
এই দুটি প্রতিষ্ঠানের হয়ে তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অংশ নেন। জুট মিলস্ ও টেক্সটাইল মিল ফুটবলের জগতে তাঁর ভূমিকা প্রশংসিত হয়।
যশোর জেলা ফুটবল দলের এক দশকের নায়ক
ভীমচন্দ্র দে ১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত যশোর জেলা দলের হয়ে ফুটবল খেলেন। এই দীর্ঘ দশ বছর তিনি দলের একজন অবিচলিত ডিফেন্ডার হিসেবে ভূমিকা রাখেন। মাঠে তাঁর অবস্থান ছিল স্টাপার ব্যাক — রক্ষণভাগে বল ক্লিয়ার, ট্যাকল এবং স্ট্র্যাটেজিক খেলায় তিনি ছিলেন দুর্দান্ত।
ঢাকা ওয়ারী ক্লাব ও প্রথম বিভাগ ফুটবলে অংশগ্রহণ
১৯৮৫ সালে তিনি ঢাকার ওয়ারী ক্লাবে যোগ দেন এবং প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগে খেলেন। এই ক্লাব পর্যায়ে তাঁর পারফরম্যান্স শহরকেন্দ্রিক ক্রীড়ামহলে তাঁর পরিচিতি আরও দৃঢ় করে তোলে।
খুলনা ফুটবলের প্রাণপুরুষ
১৯৭৩-৭৪ মৌসুমে তিনি খুলনার “ইয়ং মুসলিম ক্লাব”-এর হয়ে খেলেন। এরপর ১৯৭৫-৭৬ ও ১৯৭৭ সালে “খুলনা মুসলিম ক্লাব”-এর হয়ে মাঠে নামেন। খুলনা লীগে তাঁর ধারাবাহিক অংশগ্রহণ স্থানীয় ক্লাব ফুটবলে প্রাণসঞ্চার করে।
“প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলস্” এবং ব্যাংকার্স ক্লাবে অধ্যায়
ভীমচন্দ্র দে ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত খেলেন প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলস্ দলের হয়ে। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তিনি নিয়মিত অংশ নেন “ব্যাংকার্স ক্লাব”-এর হয়ে, যা ছিল তাঁর কর্মজীবনের সঙ্গতিপূর্ণ ফুটবল অংশগ্রহণের এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
১৯৮২ সালে অধিনায়কত্বের সম্মান
১৯৮২ সালে তিনি খুলনা “ব্যাংকার্স” দলের অধিনায়ক হন। তাঁর অধিনায়কত্বে দল একাধিক চমৎকার পারফরম্যান্স করে, যা সেই সময়ের ক্রীড়াঙ্গনে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
বিভিন্ন জেলা লিগে বিচরণ
তিনি অংশগ্রহণ করেছেন কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগে। তাঁর বিচরণ ক্ষমতা, ফিটনেস এবং নেতৃত্বগুণ তাঁকে উপমহাদেশীয় ক্লাব ফুটবলে এক উল্লেখযোগ্য নাম হিসেবে গড়ে তোলে।
সংগঠক হিসেবে ক্রীড়াঙ্গনে অবদান
ভীমচন্দ্র দে শুধু একজন খেলোয়াড় ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ ক্রীড়া সংগঠকও। তিনি “অভয়নগর উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা”-র ভলিবল সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সংগঠকসুলভ মানসিকতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্রীড়াবিদ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
এক ক্রীড়ানুরাগীর নির্মিতি
ভীমচন্দ্র দে-র জীবন হলো একজন নিঃস্বার্থ, নিষ্ঠাবান ক্রীড়াবিদের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। পেশাদার জীবনের সঙ্গে ফুটবলকে মিলিয়ে নিয়ে চলার শক্তি, মাঠে অসাধারণ পারফরম্যান্স, ক্লাব ও জেলার হয়ে একাধিকবার প্রতিনিধিত্ব, সব মিলিয়ে তিনি আমাদের ক্রীড়াঙ্গনে এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আমাদের শিক্ষা দেয় যে নিষ্ঠা, পরিশ্রম এবং ক্রীড়ার প্রতি ভালোবাসা কখনোই বৃথা যায় না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্য তাঁর জীবন হতে পারে এক অনুপ্রেরণার বাতিঘর।


