বাংলা ১৩২৯ সালে যশোর শহরের পশ্চিম-উত্তর কোণে, বর্তমান পুরাতন কসবা অঞ্চলে, ভূগর্ভ থেকে আবিষ্কৃত একটি বিষ্ণুমূর্তি এবং অন্যান্য প্রত্নসম্পদ যশোরের ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। এই আবিষ্কার শুধু ধর্মীয় দিক থেকে নয়, বরং প্রাচীন শিল্পকলার নিদর্শন হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আমরা সেই প্রত্ননিদর্শনগুলির বিস্তারিত বিবরণ, শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরছি।
নলডাঙ্গার রাজারা বহু বছর আগে তাঁদের বাড়ির পাশে একটি পুকুর খনন করছিলেন। তখন মাটির গভীর থেকে পাওয়া যায় প্রাচীন মন্দিরের ভগ্নাবশেষস্বরূপ একাধিক পাথরখণ্ড। এসব পাথর রাজমহল অঞ্চলের কঠিন প্রস্তর দিয়ে নির্মিত, যেগুলির দৈর্ঘ্য ৬ থেকে ১১ ফুট, প্রস্থ প্রায় ১৫ ইঞ্চি এবং পুরুত্ব ৯-১০ ইঞ্চি।
এই পাথরের কয়েকটি অবহেলায় পড়ে ছিল বিভিন্ন স্থানে—কয়েকটি ব্যবহার হয় রাস্তার মোড়ে পুল তৈরিতে।একটি রাখা ছিল পুকুরপাড়ে।দুটি স্থাপন করা হয় পুলিশ সুপারের বাড়ির সামনে।একটি অর্ধেক মাটির নিচে কারবালার পুকুরের কাছে, যা স্থানীয়রা দুধ দিয়ে পূজা করত।আরেকটি পাওয়া যায় বকচরের প্রাচীন জগন্নাথদেবের মন্দিরসংলগ্ন গর্ত থেকে।
এসব পাথরে ছিল সূক্ষ্ম কারুকাজ—পুলিশের বাড়ির সামনে রাখা একটি পাথরে খোদিত ছিল মঙ্গলকলস হাতে চতুর্ভুজা লক্ষ্মীমূর্তি।অন্যটিতে ছিল বিদ্যাধরের চিত্র।পদ্মপুকুরের ধারে পাওয়া পাথরে দেখা যায় দণ্ডায়মান পুরুষমূর্তি।বকচরের মন্দিরের পাথরে ছিল মকরবাহনা গঙ্গাদেবীর রূপ।
দীর্ঘ সময়ের প্রভাবে এসব খোদাই কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও এখনো তাদের শৈল্পিক ঐতিহ্য স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
পুরাতন কসবার কাছেই বামনপাড়ার একটি ইটখোলায়, প্রায় তিন হাত মাটির নিচে আবিষ্কৃত হয় এক বিরল চতুর্ভুজ বাসুদেব মূর্তি। শ্রমিকেরা মাটি কাটতে গিয়ে দেখতে পান—মূর্তিটি অন্যান্য দেবমূর্তির সাথে শায়িত অবস্থায় রয়েছে।
মূর্তিগুলি শূর্পাকৃতি কাষ্ঠফলকে উৎকীর্ণ, যেগুলির প্রস্থ ৫-৯ ইঞ্চি এবং পুরুত্ব ২-৯ ইঞ্চি। নিচে একটি কীলক ছিল, যা পাথরের বেদিতে স্থাপনের জন্য ব্যবহৃত হত। ধারণা করা হয়, এগুলি কোনো বিষ্ণু মন্দিরের সদর দরজার ফ্রেমের অংশ ছিল।মূর্তিটির দৈর্ঘ্য ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি—প্রায় একটি পূর্ণবয়স্ক মানুষের সমান।ডান থেকে বামে ক্রমানুসারে হাতে রয়েছে শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম।হিমাদ্রি ধৃত সিদ্ধান্ত সংহিতা অনুযায়ী, এ ধরনের মূর্তিকে বলা হয় ‘উপেন্দ্র’।তবে প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এটি কালিকা পুরাণে উল্লিখিত বাসুদেব মূর্তি হিসেবে চিহ্নিত।
বাসুদেব মূর্তিটি কৃষ্ণ প্রস্তরে খোদিত, যার অলঙ্করণে রয়েছে আজানুলম্বিত স্বর্ণমালার পুষ্পরচনার অপূর্ব কারুকাজ।
পদপার্শ্বে দক্ষিণ দিকে লক্ষ্মী, আর বাম দিকে সরস্বতী দণ্ডায়মান ছিলেন সুনিবিড় ভঙ্গিমায়। তাঁদের দুপাশে ছিল দুটি বিদ্যাধরের মূর্তি। বিষ্ণুর পদতলে একটি গরুর মূর্তি খোদাই করা ছিল, যা বিষ্ণুর গোপাল রূপের প্রতীক।
মূর্তির উভয় পার্শ্বে ছিল সিদ্ধচারণ বাণ, যা প্রাচীন মন্দিরের অলংকরণে ব্যবহৃত হতো। এসব নকশা কেবল শৈল্পিক সৌন্দর্যই নয়, বরং ধর্মীয় তাৎপর্য বহন করে।
এই প্রত্ননিদর্শনগুলি আবিষ্কারের পর বিভাগ-পূর্বকালে তৎকালীন আর্কিওলজিক্যাল ডিপার্টমেন্টের সুপারিন্টেনডেন্ট বিষ্ণুমন্দিরের দরজার পাথরগুলিও পরীক্ষা করেন।
পরে যশোর শহরের মাড়োয়ারী ব্যবসায়ীরা বাসুদেব মূর্তিটি সযত্নে গজযানে বহন করে স্থানীয় বেণী মাধব মিত্র মহাশয়ের মন্দিরের পাশে স্থাপন করেন।
ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের জন্য দক্ষ কারিগর আনা হয় এবং প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়। তবুও, ভগ্নাংশ সম্পূর্ণ পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়নি। করাংশ ও নাসিকাগ্র ভগ্ন থাকলেও মূর্তিটি আজও প্রাচীন শিল্পকলার এক উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
এই প্রত্নসম্পদসমূহ আমাদের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল—এগুলি প্রমাণ করে যে, যশোর অঞ্চলে প্রাচীনকালেই উন্নত মন্দির স্থাপত্য ও শৈল্পিক শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল।মূর্তির বৈশিষ্ট্য দেখে অনুমান করা যায়, এই মন্দিরগুলি সম্ভবত পাল বা সেন যুগে নির্মিত হয়েছিল।প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় এসব নিদর্শন যশোরকে বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
যশোর শহরের এই আবিষ্কার প্রমাণ করে, প্রাচীন বাংলার শিল্প, স্থাপত্য ও ধর্মীয় অনুশীলন কতটা সমৃদ্ধ ছিল। আজকের দিনে এই প্রত্ননিদর্শনগুলির সঠিক সংরক্ষণ ও গবেষণা অত্যন্ত জরুরি, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাংলার অতীতের গৌরব জানতে পারে এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১০ আগস্ট ২০২৫


