চোখের সামনে থেকেও অজানা — ডাইনোসরের জীবাশ্মের অভাবনীয় খোঁজ
প্রকৃতির বিস্ময় মাঝে মাঝে এমনভাবে সামনে আসে, যা অবাক করে দেয় বিজ্ঞানীদেরও। আমেরিকার কলোরাডোর ডেনভার শহরে অবস্থিত ডেনভার মিউজিয়াম অফ নেচার অ্যান্ড সায়েন্স-এ সম্প্রতি এমনই এক চমকপ্রদ ঘটনা সামনে এসেছে।
৭ কোটি বছর পুরোনো এক ডাইনোসরের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে মিউজিয়ামেরই কার পার্কিং-এর নিচে, অথচ এতদিন এর খোঁজ জানতেন না কেউই। বিষয়টি জানার পর বিস্ময় প্রকাশ করেছেন গবেষকরা।
গবেষণার জন্য খোঁড়াখুঁড়ি, কিন্তু মিলল ঐতিহাসিক সম্পদ
মিউজিয়ামের ভূতাত্ত্বিক গবেষকদের একটি দল স্থানীয় ভূ-গঠনের তথ্য সংগ্রহের জন্য পার্কিং এরিয়া সংলগ্ন একটি অংশে খোঁড়াখুঁড়ি করছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল মাটির স্তরের গঠন বিশ্লেষণ করা। কিন্তু খননের মাঝপথেই মাটি থেকে উঠে আসে এক প্রস্তরীভূত জীবাশ্মের খণ্ড। প্রথম নজরে দেখে কেউই বুঝতে পারেননি, এটা আদতে কতটা মূল্যবান হতে চলেছে।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গবেষকেরা নিশ্চিত হন, এটি একটি তৃণভোজী ডাইনোসরের জীবাশ্ম, যা প্রায় ৭ কোটি বছর আগের। এমন এক সন্ধান, যা সাধারণত মরুভূমি, পাহাড় বা জনমানবহীন জায়গা থেকে পাওয়া যায়—তা কিনা শহরের এক আধুনিক মিউজিয়ামের প্রাঙ্গণে লুকিয়ে ছিল!
কী ধরনের ডাইনোসর? কী বলছে গবেষণা?
ডাইনোসরের জীবাশ্মটি যে তৃণভোজী প্রজাতির, তা নিশ্চিত হলেও এখনো নির্দিষ্ট করে কোন প্রজাতির তা শনাক্ত করা যায়নি। কারণ জীবাশ্মটি আংশিক, অর্থাৎ সম্পূর্ণ কঙ্কাল পাওয়া যায়নি। এখন বিজ্ঞানীরা এর গঠন বিশ্লেষণ করে প্রজাতি শনাক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ডেনভার অঞ্চল আগে থেকেই পরিচিত ছিল ডাইনোসরের আবাসস্থল হিসেবে। ভূতাত্ত্বিক তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলটি ক্রিটেশাস যুগে (Cretaceous period) ডাইনোসরদের বিচরণভূমি ছিল। তবে একেবারে নগর এলাকার মধ্যখানে এমন জীবাশ্মের সন্ধান যে এতদিন অজানা ছিল, তা নিঃসন্দেহে চাঞ্চল্যকর।
মিউজিয়ামের আশেপাশেই লুকিয়ে প্রাচীন ইতিহাস
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়, এই জীবাশ্ম সাধারণ দর্শনার্থীদের চলাফেরা করা জায়গার ঠিক নিচেই ছিল, অথচ এতদিন কেউ কিছুই জানতেন না। ঠিক যেন নাকের ডগায় থেকেও অদৃশ্য এক গুপ্তধন!
এই আবিষ্কার প্রমাণ করে, ঐতিহাসিক নিদর্শন লুকিয়ে থাকতে পারে যেকোনো জায়গায়, এমনকি আমরা প্রতিদিন যেখানে যাই, সেই স্থানেও।
কীভাবে চলছে জীবাশ্ম বিশ্লেষণ?
বর্তমানে জীবাশ্মটি নিয়ে যাওয়া হয়েছে গবেষণাগারে, যেখানে বিস্তৃত বিশ্লেষণ, রেডিও ডেটিং ও 3D স্ক্যানিং এর মাধ্যমে এটি থেকে সময়কাল, আবহাওয়া, পরিবেশ ও প্রাণীর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তথ্য বের করার চেষ্টা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আবিষ্কার থেকে পাওয়া তথ্য শুধু ডাইনোসরের জীবনধারা নয়, বরং ডেনভার অঞ্চলের প্রাচীন ভূগোল ও পরিবেশ সম্পর্কেও নতুন আলোকপাত করতে পারবে।
বিজ্ঞান ও ইতিহাসের এক দুর্লভ মিলন
ডাইনোসরের জীবাশ্ম আবিষ্কার এমন কিছু নয় যা প্রতিদিন ঘটে। আর সেটি যদি হয় শহরের মধ্যে মিউজিয়ামের চত্বরে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে এক গবেষণার যুগান্তকারী অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।
এই ধরনের আবিষ্কার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞান ও ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, এই জীবাশ্ম আবিষ্কার ভবিষ্যতে তাদের প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠবে।
চোখের সামনে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস
এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির বিস্ময় লুকিয়ে থাকতে পারে আমাদের অজান্তেই। হয়তো যার পায়ের নিচে দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ হেঁটে যান, সেখানেই শুয়ে থাকে কোটি বছর পুরনো ইতিহাসের এক টুকরো।
ডেনভার মিউজিয়ামের পার্কিং-এর নিচে লুকিয়ে থাকা এই তৃণভোজী ডাইনোসরের জীবাশ্ম শুধুই এক প্রাণীর চিহ্ন নয়, বরং এটি এক নীরব সাক্ষী, যা বলে যায় পৃথিবীর অতীতের কথা।


